জীবন

বেচা

ডিসেম্বর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া
শেয়ার

মাসের শেষ রাত। খাতায় লিখছি।

বই—৫০০ মোবাইল—৮০০ পিতার ঘড়ি—১২০০ স্ত্রীর আংটি—২০০০

মোট ৪৫০০। এটা দিয়ে আগামী মাস চলবে।

স্ত্রী পাশে শুয়ে। ঘুমাচ্ছে কিনা জানি না। শ্বাস নিয়মিত। কিন্তু চোখ বন্ধ রাখার চেষ্টা আছে।

খাতা বন্ধ করলাম। লাইট নিভিয়ে দিলাম।

ছাদে বৃষ্টি।

পরদিন বই নিয়ে গেলাম। কলেজের বই। দশ বছর আগের।

দোকানদার পাতা উল্টাল। কভার দেখল।

কত চান?

পাঁচশ।

হাসল। তিনশ।

কিন্তু—

তিনশ। বেশি না।

বইগুলোর দিকে তাকালাম। লাল দাগ টানা। মার্জিনে নোট।

ঠিক আছে।

তিনশ টাকা নিয়ে বের হলাম। ব্যাগ খালি।

পরদিন মোবাইল নিয়ে গেলাম।

দোকানে এসি চলছে। শোকেসে নতুন মডেল।

ছেলে মোবাইল হাতে নিল। পুরনো মডেল। এখন চলে না।

কত দিতে পারবেন?

ছয়শ।

আটশ হয় না?

ছয়শ। বেশি না।

শোকেসের ভেতরে নতুন ফোন জ্বলজ্বল করছে। দাম লেখা। পঞ্চাশ হাজার। ষাট। আশি।

ঠিক আছে।

ছয়শ নিয়ে বের হলাম।

তৃতীয় দিন পিতার ঘড়ি বের করলাম।

সাদা ডায়াল। কালো ব্যান্ড। কাঁচ ফাটা। কিন্তু কাজ করে। টিকটিক।

পিতা মারা যাওয়ার আগে দিয়ে গিয়েছিলেন। হাসপাতালে। শেষ দিন।

“এটা রাখো। কাজে লাগবে।”

তখন কিছু বলিনি। শুধু নিয়েছিলাম।

এখন হাতে নিয়ে বসে আছি। টিকটিক।

ছেলে ঘরে ঢুকল। এটা কী?

ঘড়ি।

কার?

তোর দাদুর।

দাদু কই?

নেই। মারা গেছে।

মারা গেলে কোথায় যায়?

উত্তর দিলাম না। সে চলে গেল।

ঘড়ি পকেটে রাখলাম। বের হলাম।

ঘড়ির দোকান। দোকানদার ঘুরিয়ে দেখল।

পুরনো মডেল। পার্টস নেই।

তাহলে?

হাজার টাকা। বেশি না।

হাজার টাকা। পিতার ঘড়ি। শেষ উপহার।

জানালার বাইরে তাকালাম। রাস্তায় রিকশা। বাস। মানুষ।

ঠিক আছে।

হাজার টাকা নিয়ে বের হলাম। পেছনে তাকাইনি।

চতুর্থ দিন। সবচেয়ে কঠিন।

সন্ধ্যায় স্ত্রী রান্নাঘরে। পেঁয়াজ ভাজছে।

দরজায় দাঁড়িয়ে রইলাম।

তোর আংটিটা—

চুলা থেকে হাঁড়ি নামাল। গ্যাস নিভাল। ঘুরে দাঁড়াল।

নিয়ে যাও।

কিন্তু—

নিয়ে যাও। কণ্ঠ সমতল। কোনো আবেগ নেই।

হাত থেকে আংটি খুলে দিল। তারপর আবার চুলার দিকে ঘুরল।

আংটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। সোনার আংটি। হালকা। কিন্তু ভারী লাগছে।

রান্না করি। খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই।

আর কথা বলল না। হাঁড়ি চুলায় তুলল।

বের হলাম।

পরদিন সকালে স্বর্ণের দোকানে। দোকানদার মাপল।

আঠারোশ টাকা।

কম না?

এই রেট। সরকারি।

আঠারোশ নিয়ে বের হলাম।

বাসায় টাকা গুনলাম। তিনশ। ছয়শ। হাজার। আঠারোশ।

মোট ৪৩০০। পাঁচশ কম। কিন্তু চলবে।

রাতে খাবার টেবিলে তিনজন। নীরবে খাচ্ছি।

ছেলে থালায় ভাত ঠেলছে।

বাবা কাল কী করবে?

জানি না।

চাকরি করবে?

হয়তো।

কখন?

জানি না।

ছেলে আর জিজ্ঞেস করল না।

স্ত্রী পানি ঢালল। গ্লাসে শব্দ। তারপর চুপ।

বারান্দায় দাঁড়ালাম। রাত। চারপাশে বাড়ির আলো।

পকেটে ৪৩০০ টাকা। আগামী মাসের জন্য।

পরের মাসে কী বেচব?

খাতায় লেখা আছে আরও কিছু। কিন্তু সেগুলো বেচলে কী থাকবে?

আলমারি? টেবিল? ছেলের খেলনা?

জানি না।

একদিন ছেলে জিজ্ঞেস করল, আমাদের কি গরিব?

থমকে গেলাম।

কেন?

স্কুলে সবার নতুন ব্যাগ। আমার পুরনো।

নতুন ব্যাগ চাই?

মাথা নাড়ল।

পরে কিনে দেব।

কখন?

শিগগির।

আর কিছু বলল না। বই খুলে পড়তে লাগল।

ব্যাগ সত্যিই পুরনো। ছেঁড়া। কলম দিয়ে সেলাই করা।

কিন্তু নতুন কেনার টাকা নেই।

রাতে খাতা খুললাম। লিখলাম।

পুরনো জুতা—২০০ লোহার তোরঙ্গ—৫০০ দেয়ালের ঘড়ি—৩০০

লিখতে লিখতে থামলাম।

কী লিখছি? পুরো বাড়ি বেচে দেব?

খাতা বন্ধ করলাম।

একদিন স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, আমার বাবার কাছে চাইব?

না।

কেন? তিনি দিতে পারেন।

না। চাইব না।

তাহলে?

ম্যানেজ করব।

কীভাবে?

উত্তর দিলাম না। জানি না কীভাবে।

মাসের শেষ আবার।

খাতা খুলে দেখলাম। পুরনো তালিকা। কাটা দাগ।

বই—বেচেছি মোবাইল—বেচেছি পিতার ঘড়ি—বেচেছি স্ত্রীর আংটি—বেচেছি

নতুন কী লিখব?

খাতার পাতা খালি। সাদা।

কলম রাখলাম। বন্ধ করলাম।

বারান্দায় দাঁড়ালাম। আকাশে তারা নেই। মেঘ ঢেকে আছে।

আগামী মাসে কী হবে?

উত্তর নেই।

বৃষ্টি শুরু হলো। প্রথমে হালকা। তারপর জোরে।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলাম। ভিজে গেলাম।

কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম জানি না।

ভেতরে গিয়ে তোয়ালে নিলাম। মুছলাম।

বিছানায় শুয়ে সিলিং দেখলাম।

কাল সকালে উঠতে হবে। কোথাও যেতে হবে। কিছু করতে হবে।

কিন্তু কী?

জানি না।

চোখ বন্ধ করলাম।

ঘুম এল না।

কিন্তু এই গল্পের পেছনে আসল সত্যটা কী?

সত্য হলো—আমি বেচছি। প্রতিদিন। একটু একটু করে।

প্রথমে বই। তারপর মোবাইল। তারপর পিতার ঘড়ি।

শেষে স্ত্রীর আংটি।

কিন্তু আসলে কী বেচছি?

আমি বেচছি আমার অতীত।

বই—সেটা ছিল আমার স্বপ্ন। লেখক হওয়ার স্বপ্ন।

মোবাইল—সেটা ছিল আমার বর্তমান। যোগাযোগ। পৃথিবীর সাথে।

পিতার ঘড়ি—সেটা ছিল আমার শিকড়। আমি কোথা থেকে এসেছি।

স্ত্রীর আংটি—সেটা ছিল আমার ভালোবাসা। আমি কাকে ভালোবাসি।

এক এক করে সব বেচে দিচ্ছি।

কেন?

কারণ বেঁচে থাকতে হবে।

কিন্তু এভাবে বেঁচে থাকা কি আসলে বেঁচে থাকা?

যখন তোমার স্বপ্ন নেই, বর্তমান নেই, শিকড় নেই, ভালোবাসা নেই—

তখন তুমি কী?

একটা দেহ? একটা শ্বাস?

হ্যাঁ। শুধু তাই।

আর এই শ্বাস চালিয়ে যাওয়ার জন্য আমি সব বেচে দিচ্ছি।

এটা কী ধরনের জীবন?

যেখানে জীবন বাঁচানোর জন্য জীবন বেচতে হয়?

এটা কী ধরনের পৃথিবী?

যেখানে একজন পিতাকে তার পিতার ঘড়ি বেচতে হয়?

যেখানে একজন স্বামীকে তার স্ত্রীর আংটি বেচতে হয়?

আর সবচেয়ে ভয়ংকর কী জানো?

এটা শুধু আমি একা নই।

লাখ লাখ মানুষ। প্রতিদিন। একই কাজ করছে।

কেউ বেচছে বই। কেউ বেচছে সোনা। কেউ বেচছে স্মৃতি।

আর আমরা এটাকে কী বলছি?

“সাময়িক কষ্ট।” “একটু ম্যানেজ করছি।” “শিগগিরই ঠিক হয়ে যাবে।”

মিথ্যা। সব মিথ্যা।

ঠিক হবে না। কখনোই হবে না।

কারণ এই ব্যবস্থাটাই এমন।

এই ব্যবস্থা চায় তুমি বেচো। একটু একটু করে। সব।

যতক্ষণ না তোমার কাছে কিছু না থাকে।

তারপর তুমি নিজেকে বেচবে।

শ্রম বেচবে। সময় বেচবে। স্বাস্থ্য বেচবে।

আর বলবে—”আমি কাজ করছি।”

না। তুমি কাজ করছ না।

তুমি নিজেকে বেচছ।

এই পার্থক্য কেউ বলে না।

কারণ এই পার্থক্য দেখলে পুরো ব্যবস্থাটা দেখা যায়।

আর পুরো ব্যবস্থা দেখলে?

তখন বুঝতে হয় আমরা সবাই দাস।

মুক্ত নই। কখনোই ছিলাম না।

শুধু দাসত্বকে “জীবন” বলে চালিয়ে যাচ্ছি।

আর যখন একজন পিতা তার পিতার ঘড়ি বেচে?

তখন সে শুধু ঘড়ি বেচছে না।

সে বেচছে তার সংযোগ। তার অতীত। তার পরিচয়।

আর যখন একজন স্বামী তার স্ত্রীর আংটি বেচে?

তখন সে শুধু সোনা বেচছে না।

সে বেচছে তার প্রতিশ্রুতি। তার ভালোবাসা। তার মর্যাদা।

কিন্তু আমরা এসব দেখি না।

আমরা শুধু দেখি—টাকা এল। আরেক মাস চলবে।

আর এই “আরেক মাস” চালিয়ে যাওয়ার জন্য—

আমরা নিজেদের পুরোটা বেচে দিচ্ছি।

একটু একটু করে।

আর সবচেয়ে দুঃখের কী?

আমরা জানি এটা ভুল।

কিন্তু থামাতে পারি না।

কারণ বিকল্প নেই।

বা আমরা ভাবি নেই।

হয়তো আছে। কিন্তু দেখতে ভয় পাই।

কারণ সেই বিকল্প দেখতে গেলে—

এই পুরো জীবনকে প্রশ্ন করতে হবে।

এই পুরো ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করতে হবে।

আর আমরা প্রশ্ন করতে ভয় পাই।

তাই বেচতে থাকি।

একটা একটা করে সব।

যতক্ষণ না কিছু না থাকে।

তারপর?

তারপর আমরা মরি।

চুপচাপ। কোনো শব্দ ছাড়া।

আর নতুন একজন আসে।

সে-ও শুরু করে বেচা।

এই চক্র।

এই জীবন।

এই সভ্যতা।

অতীত অস্তিত্ব একাকিত্ব পরিবার বাস্তবতা বিচ্ছেদ

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

ঢাকা শহরের এক ভিড়ভাট্টা রাস্তায় মানুষজন এক নারীর প্রতি বিচার ছুঁড়ে দিচ্ছে — কেউ ভিডিও করছে, কেউ তাকিয়ে আছে। কারও মুখ স্পষ্ট নয়, সবার চোখে একই অন্ধকার। ছবিটি প্রতীক — এক সমাজের, যেখানে সবাই মুখোশ পরে বেঁচে থাকে, আর কেউই সম্পূর্ণ নিষ্পাপ নয়।

কথা

মাগি

নভেম্বর ২০২৫ · 13 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *