
চক্র
শরীর একদিন থেমে যাবে। সেদিন আমরা বুঝব — সে কতদিন ধরে বলছিল।
দুটো কণ্ঠস্বর
শরীর বলে — থামো।
আমরা বলি — না।
এই কথোপকথন জন্ম থেকে চলে। মৃত্যু পর্যন্ত চলে। মাঝখানে একটা হাসপাতাল থাকে। কখনো একটা। কখনো অনেকগুলো।
বেশিরভাগ মানুষ হাসপাতালে শুয়ে প্রথমবার শরীরের কথা শোনে।
এর আগে শোনার সময় ছিল না।
পাখির ঘড়ি
প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় বাইরে থেকে পাখি ডাকে।
ঘড়ি দেখি। ঠিক পাঁচটা।
পাখির কাছে কোনো ঘড়ি নেই। দেয়ালে কিছু ঝোলানো নেই। কেউ জাগিয়ে দেয় না।
তবু জানে।
হাজার বছর আগে মানুষও জানত। সূর্য উঠলে উঠত। অন্ধকার হলে শুত। ক্লান্ত লাগলে থামত।
তারপর ঘড়ি এল।
তারপর অফিস এল।
তারপর মানুষ নিজের শরীর ভুলে গেল।
দুপুর দেড়টা
দুপুর দেড়টায় চোখ ভারী হয়।
এটা দুর্বলতা না। এটা শরীরের হাজার বছরের নিয়ম। এই সময়ে বিশ্রাম নেওয়ার কথা।
কিন্তু আমরা কফি খাই।
গরম কফি এক চুমুকে। চোখ খোলা। মনিটরের দিকে তাকিয়ে। সবকিছু ঠিকঠাক।
মনে হয় — এটাই শক্তি।
না।
এটা যুদ্ধ। নিজের সাথে। প্রতিদিন। একই যুদ্ধ। একই মাঠে। একই দুই পক্ষ।
এই যুদ্ধে কেউ জেতে না।
সমুদ্র লজ্জা পায় না
সমুদ্রে ভাটা আসে।
সমুদ্র তখন ভাবে না — আমি কি কমে গেলাম? আমি কি দুর্বল হয়ে পড়লাম? কেউ দেখলে কী ভাববে?
শুধু সরে যায়।
তারপর জোয়ার আসে। আবার ভরে ওঠে।
পাথরের কাছে মাফ চাওয়ার দরকার নেই। ব্যাখ্যা দেওয়ার দরকার নেই। এটা চক্র — এটুকুই।
মানুষ পারে না।
দুপুরে ক্লান্ত হলে — নিজেকে দোষ দেয়।
মন খারাপ হলে — ভাবে কোথাও সমস্যা আছে।
শক্তি না থাকলে — মনে করে ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে।
সমুদ্র ব্যর্থ হয় না। সমুদ্র চক্রে থাকে।
চাঁদের হিসাব
চাঁদ প্রতি মাসে ভাঙে।
অমাবস্যায় আকাশে কিছু নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকার। মনে হয় চাঁদ চলে গেছে।
চাঁদ যায় না। চাঁদ জানে — এটা চক্র।
পূর্ণিমা আসবে।
মানুষ এটা জানে না। বা জানে, কিন্তু বিশ্বাস করে না।
মন খারাপের দিন মনে হয় — এবার থেকে সবসময় এরকমই থাকব।
শক্তি না থাকলে মনে হয় — এটা আর কোনোদিন ফিরবে না।
চাঁদ কখনো এরকম ভাবে না।
আমরা ভাবি।
দুটো ঘড়ি
দুটো ঘড়ি আছে।
একটা দেয়ালে। একটা বুকের ভেতরে।
দেয়ালের ঘড়ি বলে — নটায় অফিস।
শরীরের ঘড়ি বলে — তুমি এখনো ক্লান্ত।
কফির কাপ তুলি।
দেয়ালের ঘড়ি দেখি।
বেরিয়ে পড়ি।
কারণ দেয়ালের ঘড়ি না মানলে কী হয় সেটা জানি। চাকরি যায়। সম্মান যায়। মানুষ বলে — দায়িত্বজ্ঞানহীন।
শরীরের ঘড়ি না মানলে কী হয়?
প্রথম কিছুদিন কিছু হয় না।
তারপর একদিন বুক ধড়পড় করে।
তারপর ঘুম আসে না।
তারপর ডাক্তার বলেন — এত চাপ নেবেন না।
আমরা বলি — হঠাৎ কী হলো?
হঠাৎ না।
অনেকদিন ধরে।
শরীর বলেছিল।
আমরা শুনিনি।
একটা পুরনো কথা
একবার কেউ জিজ্ঞেস করেছিল — তুমি ক্লান্ত কেন?
বললাম — জানি না।
সে বলল — বেশি কাজ করছ?
বললাম — না।
সে চুপ করে রইল।
আমিও চুপ।
রাতের খাবার ঠান্ডা হয়ে গেল।
কেউ তুলল না।
পরদিন সকালে উঠলাম। আবার অফিস। আবার কফি। আবার ঠিকঠাক।
শরীরের ঘড়ি সেদিনও বলেছিল — থামো।
আমি বললাম — না।
পাখির সমস্যা নেই
পাখির একটাই ঘড়ি।
সূর্যের সাথে ওঠে। সূর্যের সাথে নামে।
কোনো দ্বন্দ্ব নেই। কোনো যুদ্ধ নেই। কোনো অপরাধবোধ নেই।
ক্লান্ত হলে বসে। খিদে পেলে খায়। রাত হলে ঘুমায়।
কেউ বলে না — এত তাড়াতাড়ি ঘুমাচ্ছ কেন?
কেউ বলে না — আরেকটু থাকো।
কেউ বলে না — আলস্য করলে চলবে না।
মানুষ একসময় পাখির মতো ছিল।
তারপর ঘড়ি বানাল।
তারপর নিজেকে দেখা বন্ধ করে দিল।
সকালের মিনিট
সকালে ঘুম ভাঙার পর কয়েক মিনিট শুয়ে থাকি।
ছাদের দিকে তাকিয়ে।
শরীর বলে — আরেকটু।
আমি বলি — না।
উঠে পড়ি।
এই মুহূর্তটা ছোট। কিন্তু এখানেই দিনটা শুরু হয়।
যুদ্ধ দিয়ে শুরু।
যুদ্ধ দিয়ে শেষ।
রাতে শুতে গেলে মনে হয় — অনেক কাজ হলো।
কিন্তু কী হলো ঠিকঠাক মনে নেই।
শুধু জানি — ক্লান্ত।
আবার কাল একই।
আবার কাল একই।
শরীর মিথ্যা বলে না
শরীর কখনো মিথ্যা বলে না।
বলে — ক্লান্ত।
বলে — খিদে।
বলে — একটু বসো।
আমরা বলি — এখন না।
শরীর আবার বলে।
আমরা আবার বলি — এখন না।
একদিন শরীর নিজেই থামে।
হঠাৎ না।
অনেক দিন ধরে।
ভাটার পর
সমুদ্রে ভাটা আসে।
কিন্তু জোয়ারও আসে।
চাঁদ অমাবস্যায় যায়।
কিন্তু পূর্ণিমায় ফেরে।
পাখি রাতে চুপ করে।
কিন্তু ভোরে ডাকে।
শরীরও এরকম।
ক্লান্তি চিরকাল থাকে না।
শক্তি চিরকাল থাকে না।
এটা চক্র।
কিন্তু চক্রে থাকতে হলে চক্রকে মানতে হয়।
ভাটাকে ভাটা বলতে হয়।
বিশ্রামকে বিশ্রাম বলতে হয়।
দুপুরের ঘুমকে দুর্বলতা না বলে ঘুম বলতে হয়।
আকাশের রং
সকালে বাইরে তাকাই।
পাখি ডাকছে। ভোর পাঁচটা।
আকাশ এখনো কালো। আলো আসেনি।
কিন্তু পাখি জানে — আলো আসছে।
সে দেখতে পাচ্ছে না। তবু জানে।
আমি জানি না।
আমার ঘড়িটা সঠিক সময় দেখাচ্ছে কিনা সেটাও জানি না।
দেয়ালের ঘড়িটা। বুকের ঘড়িটা।
দুটো মিলছে কিনা — এটাও জানি না।
পাখিটা ডাকছে।
আকাশে আলো নেই।
তবু ডাকছে।

একটু ভাবনা রেখে যান