ব্লগ

প্রশ্নের সামনে নিরুত্তর

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

“বাবা, আল্লাহ কে বানিয়েছে?”

আরাশের এই প্রশ্নে আমি থমকে গেলাম। এগারো বছরের এক ছেলে এমন একটা প্রশ্ন করল যার উত্তর দার্শনিকেরা খুঁজে বেড়ান।

আমি বাবা। আমার কাছে সব প্রশ্নের উত্তর থাকার কথা। কিন্তু কিছু প্রশ্ন আছে যা আমাকে নিরুত্তর করে দেয়।


সন্তানরা প্রশ্ন করে নির্ভেজাল কৌতূহল থেকে। তাদের মাথায় থাকে না যে এই প্রশ্নটা কত জটিল, কত গভীর। তারা ভাবে বাবা সবকিছু জানে।

কিন্তু আমি জানি না।

“মানুষ কেন মরে?” আরাশ একদিন জিজ্ঞেস করেছিল।

আমি বলেছিলাম, “এটা প্রকৃতির নিয়ম।”

ও আবার জিজ্ঞেস করেছিল, “কিন্তু কেন এই নিয়ম?”

আমি চুপ হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ আমি জানি না কেন মৃত্যু আছে। আমি শুধু জানি যে মৃত্যু আছে।

শিশুদের প্রশ্ন fundamental। তারা জানতে চায় কেন, কীভাবে, কী জন্য। আমাদের উত্তর surface level। আমরা বলি কী আছে, কিন্তু বলতে পারি না কেন আছে।

“বাবা, আকাশ নীল কেন?”

আমি বলি, “আলোর প্রতিফলনের জন্য।”

“কিন্তু আলো কেন প্রতিফলিত হয়?”

আমি আবার আটকে যাই।

আরাশের প্রতিটি “কেন” আমাকে আরো গভীরে নিয়ে যায়। এবং একসময় আমি পৌঁছাই এমন জায়গায় যেখানে আমার কোনো উত্তর নেই।

সন্তানদের সামনে নিরুত্তর হওয়া বাবাদের জন্য একটা অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা। আমরা মনে করি আমাদের সব জানা থাকা উচিত। কিন্তু সত্য হলো, আমরা অনেক কিছুই জানি না।

“বাবা, স্বপ্ন কোথা থেকে আসে?”

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমি বুঝি, আমি স্বপ্ন সম্পর্কে কতটা কম জানি। আমি জানি স্বপ্ন মস্তিষ্কের কার্যকলাপ, কিন্তু জানি না কেন আমি নির্দিষ্ট স্বপ্ন দেখি।

আরাশের প্রশ্নগুলো আমাকে আমার সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি করে। আমি যা জানি তা খুবই কম। আমি যা জানি না তা অসীম।

“বাবা, আমি কেন আমি? আমি কেন অন্য কেউ না?”

এই প্রশ্নে আমি সম্পূর্ণ হতবাক। এটা identity এর সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন। আমি কোথা থেকে উত্তর আনব?

আমি বুঝি, সন্তানদের মন অনেক বেশি দার্শনিক। তারা এমন প্রশ্ন করে যা আমাদের existence এর গভীরে স্পর্শ করে।

মাঝে মাঝে আমি বলি, “এটা আল্লাহই ভালো জানেন।” কিন্তু এই উত্তর আরাশকে সন্তুষ্ট করে না। ও আরো জানতে চায়।

“আল্লাহ কেন আমাদের বানিয়েছেন?”

এই প্রশ্নে আমি theological জবাব দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু আরাশের কাছে সেই জবাব যথেষ্ট মনে হয় না।

আমি বুঝি, শিশুরা abstract concept নিয়ে অনায়াসে ভাবতে পারে। তাদের মন concrete reality দিয়ে সীমাবদ্ধ নয়।

“বাবা, সময় কী?”

এই প্রশ্নে আমি complete shut down হয়ে যাই। সময় সম্পর্কে আমার ধারণা একেবারেই surface level।

কিন্তু আরাশের এই প্রশ্নগুলো আমাকে ভাবতে শেখায়। আমি নিজেও শুরু করি এই প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবতে।

আমি বুঝি, সন্তানরা আমাদের শুধু দায়িত্ব দেয় না, তারা আমাদের জ্ঞানের পিপাসাও জাগিয়ে দেয়।

আরাশের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে আমি নিজেই পড়াশোনা শুরু করি। আমি বুঝি, বাবা হওয়া মানে শুধু শেখানো নয়, শেখাও।

যখন আমি আরাশকে বলি, “আমি জানি না,” তখন আমি দুর্বলতা প্রকাশ করি না। আমি সততা প্রকাশ করি।

এবং এই সততা আরাশকে শেখায় যে সবকিছু জানা সম্ভব নয়। কিছু প্রশ্ন থেকে যায় অনুত্তরিত। এবং সেটাই জীবনের সৌন্দর্য।

আমি আরাশকে বলি, “এটা একটা চমৎকার প্রশ্ন। চলো একসাথে খুঁজে বের করি।”

এভাবে আমি আরাশের কৌতূহলকে encourage করি। আমি ওকে বুঝিয়ে দিই যে প্রশ্ন করা ভালো, এমনকি যদি উত্তর না পাওয়া যায়।

কারণ প্রশ্নই আমাদের মানুষ করে তোলে। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই আমাদের জীবনের অর্থ।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *