আজ সকালে আরাশকে দেখলাম একটা ভিডিও দেখছে। “আজ আর কোনো প্রশ্ন নেই?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“কেন করব বাবা? ইউটিউবে সব উত্তর আছে।”
আমি থমকে গেলাম। এই ছেলেটা যে একসময় প্রতিদিন আমাকে হাজার প্রশ্ন করত – “আকাশ কেন নীল?” “পাখি কেন উড়ে?” “মানুষ কেন কাঁদে?” – সে কখন প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিল?
আমার ভিতরে একটা অ্যাপ ক্র্যাশ করল যার নাম “কৌতূহলের মৃত্যু ভার্সন অজানা”।
অফিসে সহকর্মীদের দেখি কেউ আর কোনো প্রশ্ন করে না। বস যা বলে, সেটাই মেনে নেয়। নতুন পদ্ধতি, নতুন নিয়ম – কেউ জানতে চায় না কেন।
“তোমরা প্রশ্ন করো না কেন?”
“স্যার, প্রশ্ন করলে মনে করে আমরা কিছু জানি না।”
কিন্তু আমার মনে পড়ল, আমার ছোটবেলায় আমিও তো প্রশ্ন করতাম না। বাবা যা বলতেন, সেটাই মানতাম। কখন থেকে এই ভয় শুরু হয়েছিল?
রাতে হ্যাপিকে বললাম, “আমাদের কৌতূহল কখন মারা গেল?”
“কেমন?”
“মানে, আমরা কখন প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিলাম?”
হ্যাপি একটু ভেবে বলল, “হায়দার, তুমি কি মনে করো স্কুলের পর থেকে?”
“কেন?”
“স্কুলে আমাদের শেখানো হতো উত্তর মুখস্থ করতে। প্রশ্ন করতে নয়।”
আমি বুঝলাম। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা প্রশ্নকারীদের পুরস্কৃত করে না, উত্তরদাতাদের করে।
পরদিন আরাশকে বললাম, “তুই কি জানিস পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষরা সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন করেন?”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রশ্ন করা বন্ধ না করা।'”
আরাশের চোখে আগ্রহ ফিরে এলো। “বাবা, তাহলে আমি প্রশ্ন করব?”
“অবশ্যই।”
“আচ্ছা, মানুষ কেন প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়?”
আমি হেসে ফেললাম। এই তো আমার আরাশ।
রহিম চাচার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “চাচা, আপনার কি মনে হয় আমাদের কৌতূহল কখন মারা যায়?”
“বাবা, যখন আমরা মনে করতে শুরু করি যে আমরা সব জানি।”
“কিন্তু আমরা তো কিছুই জানি না।”
“জানি। কিন্তু স্বীকার করতে ভয় পাই।”
নামাজ পড়ে ভাবছিলাম। আল্লাহর কাছে আমি সবসময় প্রশ্ন করি। “কেন আমার এত কষ্ট?” “কেন আমার চাকরি যায়?” তিনি কখনো বলেন না “প্রশ্ন করো না।”
হয়তো কৌতূহল মরে যায় না। আমরা সেটাকে ভয়ের নিচে চাপা দিই।
আরাশকে বললাম, “তুই যদি প্রশ্ন করিস, লোকে কী বলবে সেটা নিয়ে চিন্তা করিস না। প্রশ্ন করাটাই তোর অধিকার।”
“কিন্তু যদি কেউ উত্তর না দিতে পারে?”
“তাহলে একসাথে খুঁজে বের করব।”
কৌতূহল কখনো শেষ হয় না। আমরা সেটাকে শেষ করে দিই নিরাপত্তার জন্য। প্রশ্ন না করলে বোকা প্রমাণিত হওয়ার ভয় নেই।
কিন্তু প্রশ্ন না করলে জানার আনন্দও নেই।
হয়তো আমাদের কৌতূহল শেষ হয়নি। শুধু ঘুমিয়ে আছে। একটা প্রশ্ন দিয়েই জাগিয়ে তোলা যায়।
একটু ভাবনা রেখে যান