ব্লগ

আত্মপ্রতারণার কারখানা

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

I. চেতনার স্তরসমূহ

তিনি বসে আছেন প্রথম সারিতে। তার নাম আশরাফ। বয়স পঞ্চাশ। মনে মনে গুনছেন – এই মাহফিলে আসা মানুষগুলোর মধ্যে কতজনের সাথে তার ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।

কিন্তু তিনি এটা ভাবছেন বলে জানেন না। তার চেতনার উপরিভাগে ভাসছে – আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার ইচ্ছা। গভীরে চলছে অন্য হিসাব।

এই দ্বিতীয় স্তরটি তিনি অস্বীকার করেন। কারণ অস্বীকার করাটাই তার অস্তিত্বের শর্ত। স্বীকার করলে তিনি হয়ে উঠবেন অসহনীয় – নিজের কাছে।

হুজুর সাহেব বলছেন সততার কথা। আশরাফের হৃদয় কেঁপে ওঠে – সত্যিকারের কম্পন। তিনি মনে করেন এটি আল্লাহর ভয়। কিন্তু আসলে এটি আবিষ্কৃত হওয়ার ভয়।

গতকাল তিনি একটি টেন্ডারে মিথ্যা কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। কিন্তু মনে মনে বলেছেন – এটা তো সবাই করে। আমি একা করলে কী হবে? সিস্টেমটাই এমন।

এই যুক্তিটি তার কাছে খুবই সন্তোষজনক। কারণ এতে তার দায় থাকে না। দায় থাকে সিস্টেমের।

II. অপরের দর্পণে নিজ

সামনের সারিতে বসা মহিলা ফাতেমা। তিনি আশরাফকে দেখছেন। ভাবছেন – এই লোকটা কত ভণ্ড। গতমাসে তার স্বামীকে কেমন ঠকিয়েছে।

কিন্তু ফাতেমা ভুলে যাচ্ছেন – গতসপ্তাহে তিনি তার কাজের মেয়েকে বেতন দেননি। অজুহাত ছিল – টাকা নেই। অথচ সেদিনই নতুন গহনা কিনেছেন।

তিনি এই দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো সংযোগ দেখেন না। কারণ একটি “অন্যায়”, অন্যটি “পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতা”।

মানুষ নিজেকে দেখে অপরের মধ্যে। আশরাফ ফাতেমার মধ্যে দেখে তার নিজের লোভ। ফাতেমা আশরাফের মধ্যে দেখে তার নিজের নিষ্ঠুরতা। কিন্তু এই দেখাটি ঘটে অজ্ঞানে। চেতনে ঘটে কেবল নিন্দা।

প্রতিটি নিন্দা একটি আত্মরক্ষা। প্রতিটি ক্রোধ একটি আত্মগোপন।

III. ভাষার ছলনা

হুজুর সাহেব বলছেন – “তোমরা যারা এখানে এসেছো, তোমরা নিশ্চয়ই আল্লাহর পথের মুসাফির।”

এই ‘তোমরা’ শব্দটি একটি জাদুর মতো কাজ করে। প্রত্যেকে ভাবে – হ্যাঁ, আমি আল্লাহর পথের মুসাফির। আমি অন্যদের মতো নই।

ভাষা এভাবে সৃষ্টি করে একটি কাল্পনিক পরিচয়। যে পরিচয়ে মানুষ নিজেকে লুকিয়ে রাখে।

পেছনের সারিতে বসা যুবক রাশেদ। তার পকেটে চুরি করা মোবাইল। কিন্তু তিনি বলেন – আমি পেয়েছি। কেউ ফেলে গেছে।

‘পাওয়া’ আর ‘চুরি’ – দুটি ভিন্ন শব্দ। দুটি ভিন্ন পরিচয়। একটিতে পাপী, অন্যটিতে ভাগ্যবান।

শব্দ পরিবর্তন করে বাস্তবতা পরিবর্তন করে না। কিন্তু পরিবর্তন করে আত্মপরিচয়।

IV. অস্তিত্বের নিঃসঙ্গতা

কিন্তু একা থাকার মুহূর্তে কী হয়? রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে? অন্ধকারে, নিরবতায়?

আশরাফ তখন জানেন তিনি কে। ফাতেমা তখন দেখেন তার নিজের মুখ। রাশেদ তখন অনুভব করেন তার হাতের ভার।

কিন্তু সকালে উঠে তারা আবার পরে নেন মুখোশ। কারণ মুখোশ ছাড়া বাঁচা যায় না।

একা থাকার মুহূর্তেই মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। কারণ তখন কোনো দর্শক নেই। কোনো অভিনয় চলে না। কেবল থাকে নিজের সাথে নিজের মুখোমুখি হওয়া।

আর সেই মুখোমুখি হওয়া অসহনীয়। কারণ সেখানে থাকে না কোনো যুক্তি, কোনো অজুহাত। থাকে কেবল সত্য।

V. আত্মপ্রতারণার প্রয়োজনীয়তা

কিন্তু এই আত্মপ্রতারণা কি কেবল দুর্বলতা? নাকি এটি অস্তিত্বের একটি অপরিহার্য শর্ত?

যদি আশরাফ সম্পূর্ণ সত্যের মুখোমুখি হন, তিনি হয়তো পারবেন না আর কাজ করতে। যদি ফাতেমা দেখেন তার সমস্ত নিষ্ঠুরতা, তিনি হয়তো পারবেন না আর বাঁচতে।

আত্মপ্রতারণা হয়তো একটি প্রতিরক্ষা – সহনীয় মাত্রায় বেঁচে থাকার জন্য।

কিন্তু তাহলে সত্য কী? মুখোশের নিচে যা লুকানো, নাকি মুখোশটাই?

হয়তো উভয়ই সত্য। হয়তো মানুষ একই সাথে ভালো ও মন্দ, পবিত্র ও কলুষিত। এবং এই দ্বৈততাই তার অস্তিত্বের মূল।

VI. নিরবতার সত্য

ওয়াজ মাহফিল শেষ। সবাই বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। আশরাফ, ফাতেমা, রাশেদ – সবাই।

তারা ফিরে যাচ্ছে তাদের নিজ নিজ জীবনে। যেখানে আবার শুরু হবে অভিনয়। আবার সৃষ্টি হবে নতুন যুক্তি, নতুন অজুহাত।

কিন্তু একটি মুহূর্তের জন্য – মাহফিল শেষ হওয়ার পর, বাড়ি যাওয়ার আগে – একটি নিরবতা নেমে আসে।

সেই নিরবতায় কোনো শব্দ নেই। কোনো যুক্তি নেই। কেবল আছে একটি স্বীকারোক্তি – আমি জানি আমি কে।

আর সেই জানাটাই হয়তো প্রকৃত ইবাদত। নিজের সত্যের সামনে দাঁড়ানো। মুখোশ সহ, কিন্তু মুখোশের অস্তিত্ব স্বীকার করে।

কারণ মুখোশ অস্বীকার করা আরেক ধরনের মুখোশ পরা।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *