ব্লগ

কাউন্টার থেকে কাউন্টারে ঘুরে অবশেষে প্রথম কাউন্টারে ফেরা

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

অফিসের করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ খেয়াল করলাম আমি একটা চক্রে ঘুরছি। আজ সকালে যে কাউন্টারে দাঁড়িয়েছিলাম, এখন বিকেলে আবার সেই একই জায়গায় ফিরে এসেছি। যেন আমি একটা গোলাকার পথে হাঁটছি।

প্রথম কাউন্টারে বলেছিল, “আপনার কাগজে একটা সমস্যা আছে। দ্বিতীয় কাউন্টারে যান।”

দ্বিতীয় কাউন্টারে বলেছিল, “এই কাগজ এখানে হবে না। তৃতীয় কাউন্টারে যেতে হবে।”

তৃতীয় কাউন্টারে বলেছিল, “আপনার একটা স্বাক্ষর নেই। চতুর্থ কাউন্টারে যান।”

চতুর্থ কাউন্টারে বলেছিল, “এই স্বাক্ষর ভুল জায়গায়। পঞ্চম কাউন্টারে যেতে হবে।”

এভাবে আমি পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম কাউন্টারে গেছি। প্রতিজন বলেছে পরের কাউন্টারে যেতে। আর এখন অষ্টম কাউন্টারের লোক বলছে, “আপনাকে প্রথম কাউন্টারে যেতে হবে।”

আমি বললাম, “আমি তো সেখান থেকেই এসেছি।” সে বলল, “তাহলে আবার যান। হয়তো ভুল বুঝেছেন।”

আমি আবার প্রথম কাউন্টারে গেলাম। সেই একই কেরানি। সেই একই টেবিল। সেই একই ফাইলের স্তূপ।

কেরানি আমাকে দেখে বলল, “আপনি আবার এসেছেন? আপনাকে তো দ্বিতীয় কাউন্টারে যেতে বলেছিলাম।”

আমি বললাম, “আমি সব কাউন্টার ঘুরে এসেছি। সবাই বলছে অন্য জায়গায় যেতে।”

সে আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন আমি মিথ্যা বলছি। তারপর বলল, “আপনার কাগজ নিয়ে আসুন।”

আমি কাগজ দিলাম। সে দেখে বলল, “এই কাগজে একটা সমস্যা আছে। দ্বিতীয় কাউন্টারে যান।”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “আপনি সকালেও এই একই কথা বলেছিলেন।” সে বলল, “তাহলে কেন আবার এসেছেন?”

আমি বুঝলাম এটা একটা অন্তহীন চক্র। আমি যত কাউন্টারে যাব, প্রত্যেকেই আমাকে পরের কাউন্টারে পাঠাবে। আর শেষে আবার প্রথম কাউন্টারে ফিরে আসতে হবে।

এই চক্রে আমি একা নই। অনেক মানুষ এভাবে ঘুরছে। একজন বৃদ্ধ বলল, “আমি তিন দিন ধরে এই চক্কর দিচ্ছি।”

একজন মহিলা বলল, “আমার বাচ্চার জন্য জরুরি কাগজ লাগবে। কিন্তু কেউ করে দিচ্ছে না।”

আমি ভাবলাম, এই চক্র কি কখনো ভাঙে? নাকি আমরা সারাজীবন এভাবেই ঘুরতে থাকব?

হ্যাপি সকালে বলেছিল, “তাড়াতাড়ি কাজ সেরে এসো।” কিন্তু এই কাজ কি কখনো শেষ হয়?

আরাশের জন্য যে কাগজটা দরকার, সেটা কি কোনোদিন হবে? নাকি সে বড় হয়ে যাবে, কিন্তু কাগজ হবে না?

আমি আবার দ্বিতীয় কাউন্টারে গেলাম। জানি সে আমাকে তৃতীয় কাউন্টারে পাঠাবে। তৃতীয় কাউন্টার আমাকে চতুর্থে পাঠাবে। এভাবে আমি আবার প্রথম কাউন্টারে ফিরে আসব।

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, “হে আল্লাহ, এই চক্র থেকে মুক্তি দাও।” কিন্তু মনে হয় আল্লাহর কাছেও একটা কাউন্টার আছে। সেখানেও হয়তো বলবে, “পরের কাউন্টারে যান।”

আমি বুঝতে পারছি এই চক্রের কোনো সমাধান নেই। এটা এমনভাবে তৈরি যাতে কেউ বের হতে না পারে।

হয়তো এটাই উদ্দেশ্য। আমাদের চক্কর দেওয়ানো। আমাদের ক্লান্ত করা। যাতে একসময় আমরা হাল ছেড়ে দেই।

কিন্তু আমি হাল ছাড়তে পারি না। কারণ আরাশের সেই কাগজ লাগবে।

তাই আমি আবার শুরু করব। প্রথম কাউন্টার থেকে দ্বিতীয়, দ্বিতীয় থেকে তৃতীয়। এভাবে চক্কর দিতে থাকব।

যতদিন না এই চক্রটা ভেঙে যায়। অথবা আমি হেরে যাই।

এই দুটোর মধ্যে কোনটা আগে হবে, জানি না।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *