ব্লগ

ষোলো বছরের বিজয়

নভেম্বর ২০২৫ · 9 মিনিটে পড়া
শেয়ার

প্রথম ‘না’-এর রাত

সেই রাতে আমি জানতাম ইতিহাস হচ্ছে। বড় ইতিহাস নয় — কোনো যুদ্ধ নয়, কোনো বিপ্লব নয়, কোনো সাম্রাজ্যের পতন নয়। কিন্তু আমার ইতিহাস। একটি ষোলো বছরের ছেলের ভেতরে যে শিশুটি এতদিন বাস করত, সে সেই রাতে মারা গিয়েছিল। তার কবর খুঁড়েছিলাম আমি নিজেই, পার্কের ঘাসে বসে, বন্ধুদের হাসির শব্দের মধ্যে, আকাশে তারা গুনতে গুনতে।

“রাত আটটার মধ্যে বাড়ি ফিরবি।”

বাবার কণ্ঠস্বরটা এখনো কানে বাজে — সেই চূড়ান্ততা, সেই অপ্রশ্নেয় কর্তৃত্ব, সেই হাজার বছরের পিতৃতান্ত্রিক ঐতিহ্যের ভার। কিন্তু সেদিন সেই কণ্ঠ আমার কাছে এসেছিল একটা চ্যালেঞ্জের মতো, একটা দেয়ালের মতো যা ভাঙতে হবে, একটা শেকলের মতো যা ছিঁড়তে হবে। আমার ষোলো বছরের রক্ত গরম হয়ে উঠেছিল — সেই রক্ত যা প্রতিটি কিশোরের শিরায় বইতে শুরু করে যখন সে প্রথমবার বোঝে যে তার নিজের একটা মন আছে, নিজের একটা ইচ্ছা আছে, নিজের একটা পৃথিবী আছে।

কেন আটটা? কেন নয়টা নয়? কে বানিয়েছে এই নিয়ম? কোন প্রাচীন পাথরে খোদাই করা আছে যে ষোলো বছরের ছেলেকে রাত আটটায় বাড়ি ফিরতে হবে? এই প্রশ্নগুলো সেদিন আমার মাথায় ঘুরছিল বিষাক্ত মৌমাছির মতো — প্রতিটি প্রশ্ন একটা হুল, প্রতিটি হুল একটুকরো বিদ্রোহ।

বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম পার্কে। ক্রিকেট খেলা শেষ, ব্যাট-বল গুছিয়ে রাখা হয়েছে, এখন শুধু কথা আর কথা। রাকিব বলছিল তার প্রথম প্রেমের কথা — সেই মেয়েটার কথা যে তাকে একবার হেসেছিল বাস স্ট্যান্ডে। শাওন বলছিল পরীক্ষার রেজাল্টের ভয়ের কথা। আমি শুনছিলাম, কিন্তু শুনছিলাম না। আমার কান ছিল সময়ের দিকে — আট, নয়, দশ — ঘড়ির কাঁটা টিক টিক করে এগিয়ে যাচ্ছিল, আর প্রতিটি টিকের সাথে আমার ভেতরে একটা উত্তেজনা বাড়ছিল।

আমি জানতাম বাড়িতে ঝড় উঠছে। মা হয়তো জানালার পর্দা সরিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছেন, তার চোখে সেই চিরকালীন মায়ের দুশ্চিন্তা — ছেলে কোথায়, ছেলে ভালো আছে তো, ছেলের কিছু হয়নি তো। বাবা হয়তো ড্রয়িংরুমে পায়চারি করছেন, তার রাগ ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে মেঘের মতো, যে মেঘ থেকে নামবে বজ্রপাত। আমি এই সব জানতাম। কল্পনা করতে পারতাম প্রতিটি দৃশ্য।

কিন্তু আমি নড়িনি।

সেই না-নড়াটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা। সেই না-নড়াটাই ছিল আমার প্রথম ‘না’ — মুখে উচ্চারিত নয়, কিন্তু সারা শরীর দিয়ে বলা। প্রতিটি পেশি দিয়ে, প্রতিটি শ্বাস দিয়ে, প্রতিটি নিশ্বাস দিয়ে বলা — আমি যাব না। আমি এখানে থাকব। কারণ আমি চাই।

রাত এগারোটায় বাড়ি ফিরেছিলাম। পুরো রাস্তা হেঁটে এসেছিলাম ধীরে ধীরে, যেন প্রতিটি পদক্ষেপ একটা বিজয়ের চিহ্ন। গেট খুলতেই প্রথম যে শব্দ কানে এলো — মায়ের কান্না। সেই কান্নায় ভয় ছিল, রাগ ছিল, স্বস্তি ছিল, অভিমান ছিল। একজন মায়ের কান্নায় কত রকম অনুভূতি মিশে থাকতে পারে, সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম। বাবা দাঁড়িয়েছিলেন দরজায় — একটা কালো সিলুয়েটের মতো, তার পেছনে ড্রয়িংরুমের আলো। তার চোখ দেখতে পাচ্ছিলাম না, কিন্তু জানতাম সেখানে ক্রোধ আছে, হতাশা আছে, আর হয়তো একটুকরো আঘাতও আছে — ছেলে অবাধ্য হলো, এই আঘাত।

“কোথায় ছিলি?” — বাবার কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু সেই শান্ততা ঝড়ের আগের নীরবতার মতো।

“বন্ধুদের সাথে।” — আমার কণ্ঠও শান্ত। আমি অবাক হয়েছিলাম নিজের শান্ততায়।

“সময় দেখেছিস?”

“হ্যাঁ।”

এই একটি শব্দ — ‘হ্যাঁ’ — সেদিন পুরো পৃথিবী বদলে দিয়েছিল। আমি জানতাম সময়। আমি জেনেশুনে দেরি করেছিলাম। এটা ভুলে যাওয়া নয়, এটা অবহেলা নয় — এটা সচেতন সিদ্ধান্ত। এই স্বীকারোক্তিটাই ছিল আমার আসল বিদ্রোহ।

বাবা শাস্তি দিয়েছিলেন। এক সপ্তাহ ঘরে বন্দী — স্কুল ছাড়া কোথাও যাওয়া নিষেধ, বন্ধুদের সাথে দেখা নিষেধ, ফোনে কথা বলা নিষেধ। কিন্তু সেই বন্দীদশায় বসে আমার ভেতরে জ্বলছিল একটা আগুন — জয়ের আগুন। আমি পেরেছি। আমি আমার ইচ্ছামতো কাজ করতে পেরেছি। শাস্তি পেয়েছি, কিন্তু হেরে যাইনি। কারণ হারের সংজ্ঞা তখন আমার কাছে ছিল ভিন্ন — হার মানে নতি স্বীকার করা, হার মানে ক্ষমা চাওয়া, হার মানে বলা যে আমি ভুল করেছি। আমি সেসব করিনি।

সেই রাত থেকে আমি আলাদা মানুষ হয়ে গিয়েছিলাম। আয়নায় নিজেকে দেখতাম অন্যভাবে। আগে দেখতাম একটা ছেলে — বাবা-মায়ের ছেলে, স্কুলের ছাত্র, পরিবারের সদস্য। সেই রাতের পর দেখতাম একজন মানুষ — যার নিজের ইচ্ছা আছে, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আছে, নিজের পথে হাঁটার সাহস আছে।

এখন আরাশের দিকে তাকাই। এগারো বছরের এই ছেলেটি এখনো আমার কথা মানে। যখন বলি পড়তে বসো, বসে। যখন বলি টিভি বন্ধ করো, করে। কিন্তু মাঝে মাঝে তার চোখে একটা প্রশ্ন দেখি — সেই একই প্রশ্ন যা আমার চোখে ছিল ষোলো বছর বয়সে। কেন? কেন এই নিয়ম? কে বানিয়েছে? তার ভেতরেও কি জাগছে সেই একই বিদ্রোহ? সেই একই আগুন?

আমি কি চাই সে বিদ্রোহ করুক? এই প্রশ্নটা আমাকে রাতে জাগিয়ে রাখে। একদিকে আমি চাই সে বাধ্য থাকুক — কারণ বাধ্য সন্তান সহজ, বাধ্য সন্তান নিরাপদ, বাধ্য সন্তান দুশ্চিন্তা কম দেয়। কিন্তু অন্যদিকে আমি জানি, যে কখনো বিদ্রোহ করে না, সে কখনো পুরোপুরি মানুষ হয়ে ওঠে না। যে কখনো ‘না’ বলতে শেখে না, সে সারাজীবন অন্যের ‘হ্যাঁ’-এর দাস থেকে যায়। এই দুই ইচ্ছার মাঝে দোলাচলের নামই হয়তো পিতৃত্ব — এই যন্ত্রণার নামই হয়তো সন্তানকে ভালোবাসা।

কৈশোরের সেই বিদ্রোহের স্বাদ এখনো জিভে লেগে আছে। তেতো-মিষ্টি — যেমন হয় কাঁচা আমের স্বাদ, যেমন হয় প্রথম সিগারেটের ধোঁয়া, যেমন হয় নিষিদ্ধ সবকিছুর স্বাদ। গর্বিত অনুশোচনা — এমন একটা অনুভূতি যার নাম দেওয়া কঠিন। আমি ভুল করেছিলাম — মা কেঁদেছিলেন, বাবা আঘাত পেয়েছিলেন, পরিবারে অশান্তি হয়েছিল। কিন্তু আবার ঠিকও করেছিলাম — কারণ সেদিন আমি শিখেছিলাম যে আমার একটা পৃথক অস্তিত্ব আছে, আমি শুধু কারো ছেলে নই, আমি আমি।

মা পরে একদিন বলেছিলেন, চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে, “তোর বাবাও একবার এরকম করেছিল। দাদার কথা না শুনে সারারাত বাইরে ছিল।” সেদিন আমি বুঝেছিলাম — এটা একটা চক্র। প্রতিটি প্রজন্ম নিজের স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেয় আগের প্রজন্মের হাত থেকে। আর তারপর নিজেই পরের প্রজন্মের কাছে সেই স্বাধীনতা আটকে রাখার চেষ্টা করে। এই যুদ্ধ শেষ হয় না। এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার কথাও নয়।

আরাশের সময় এলে আমি কী করব? সেদিন কি আমি রাগ করব — যেমন বাবা করেছিলেন? নাকি গোপনে একটু গর্বিত হব যে ছেলে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখছে, নিজের গলায় নিজের কথা বলতে শিখছে? হয়তো দুটোই করব। হয়তো সেদিন আমি বুঝব পিতৃত্বের সেই জটিল গণিত — যেখানে রাগ আর গর্ব, ভয় আর আশা, কষ্ট আর আনন্দ সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

সেই ষোলো বছরের রাতে আমি অনেক কিছু জানতাম না। জানতাম না যে স্বাধীনতা এত ভারী — প্রতিটি স্বাধীন সিদ্ধান্তের সাথে আসে একটা দায়িত্ব, একটা পরিণতি, একটা মূল্য। জানতাম না যে প্রতিটি ‘না’ বলার সাথে একটা ‘হ্যাঁ’-ও বলতে হয় — না বলছি এই নিয়মকে, কিন্তু হ্যাঁ বলছি আমার নিজের পথকে, আর সেই পথের সব কাঁটা আমাকেই মাড়াতে হবে। জানতাম না যে বিদ্রোহ আর দায়িত্ববোধ — এই দুইয়ের ভারসাম্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রাপ্তবয়স্কতার আসল চাবি।

আজ বুঝি, সেই রাতে আমি শুধু দেরি করে বাড়ি ফিরিনি। আমি আসলে একটা সীমানা পেরিয়ে এসেছিলাম — শৈশব আর যৌবনের সীমানা, নির্ভরতা আর স্বাধীনতার সীমানা, শিশু আর মানুষের সীমানা। সেই সীমানা পেরোনোর পথটা ছিল তিন ঘণ্টার দেরি — মাত্র তিন ঘণ্টা, কিন্তু সেই তিন ঘণ্টায় আমি চিরকালের জন্য বদলে গিয়েছিলাম।

আরাশ একদিন এই পথ হাঁটবে। সে একদিন তার নিজের ‘না’ খুঁজে পাবে। সেদিন আমি দাঁড়িয়ে থাকব দরজায় — ঠিক যেমন আমার বাবা দাঁড়িয়েছিলেন। আমার চোখেও থাকবে সেই একই ক্রোধ, একই হতাশা, একই গোপন গর্ব। আর আমি জানব, চক্রটা সম্পূর্ণ হলো। আরেকটি শিশু মানুষ হয়ে উঠল। আরেকটি ডানা মেলল আকাশে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *