আরাশের আজ এগারো বছর। কিন্তু আজ সকালে তার মুখ দেখে আমার মনে পড়ে গেলো সেই দিনটার কথা। দশ বছর আগের কথা। যেদিন আরাশ প্রথম কথা বলেছিল।
“বাবা।”
এই একটা শব্দ আমার সারা জীবনটা পাল্টে দিয়েছিল।
সেদিন সকালবেলা। আমি আর হ্যাপি বসে ছিলাম আরাশকে নিয়ে। তেরো মাসের আরাশ মেঝেতে খেলা করছিল। হঠাৎ সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল—”বাবা।”
আমি থেমে গেলাম। হ্যাপিও। আমরা দুজনেই চুপ হয়ে গেলাম। আরাশ আবার বলল—”বাবা।” এবার স্পষ্ট। এবার নিশ্চিত।
আমার চোখে পানি এসে গেল। কেন? এটা তো স্বাভাবিক। সব বাচ্চারাই একসময় কথা বলে। তাহলে আমি কেন কাঁদছি?
হ্যাপি আমার হাত ধরল। তারও চোখে পানি। আমরা দুজনে কাঁদছি, আর আরাশ হাসছে। সে বুঝতে পারছে না যে সে এইমাত্র একটা জাদু করেছে।
কিন্তু সেটা কী জাদু? একটা শব্দ বলা? “বাবা” বলা? এর মধ্যে এমন কী আছে যা আমাকে এত আবেগাপ্লুত করল?
আমি আরাশকে কোলে তুলে নিলাম। “আবার বলো,” আমি বললাম। আরাশ আমার মুখের দিके তাকিয়ে আবার বলল—”বাবা।” আমার মনে হল—পৃথিবীর সব সুন্দর শব্দ একসাথে শুনলাম।
কিন্তু প্রশ্ন এলো মনে—এই “বাবা” শব্দটা কী আসলে? আরাশ কি জানে এর মানে? নাকি সে শুধু একটা শব্দ বলেছে? তাহলে আমি কেন এত আবেগাপ্লুত?
হয়তো কারণ এই শব্দটা আমাকে একটা পরিচয় দিয়েছে। আমি “হায়দার” থেকে “বাবা” হয়ে গেলাম। কিন্তু এই পরিচয়টা কি আরাশ দিয়েছে, নাকি আমি নিয়েছি?
আরাশ যখন “বাবা” বলল, তখন কি সে আমাকে চিনেছে? নাকি আমি নিজেকে চিনেছি? হয়তো আমরা দুজনেই একসাথে একে অপরকে আবিষ্কার করেছি।
হ্যাপি বলল, “তোমাকে ডাকছে।” আমি বললাম, “কিন্তু সে কি জানে আমি কে?” হ্যাপি বলল, “তুমি তার বাবা।” “কিন্তু বাবা মানে কী?” “যে তাকে ভালোবাসে।” “তাহলে ভালোবাসা মানে কী?”
হ্যাপি হেসে বলল, “তুমি আবার শুরু করলে।” কিন্তু আমি থামতে পারলাম না। এই প্রথম কথার মধ্যে কত বড় রহস্য লুকিয়ে আছে।
আরাশ এর আগে কান্নাকাটি করত, হাসত, ইশারা করত। কিন্তু কথা বলত না। আর আজ সে কথা বলল। এই “কথা বলা”টা আসলে কী? শুধু শব্দ করা? নাকি এর চেয়ে বেশি কিছু?
আমার মনে হল—আরাশ আজ ভাষার জগতে প্রবেশ করল। যে জগতে আমি আছি। হ্যাপি আছে। সবাই আছে। সে আর একা নেই তার নিজের জগতে। সে আমাদের জগতে এসেছে।
কিন্তু এটা কি লাভ, নাকি ক্ষতি? ভাষার জগতে তো ব্যথা আছে। মিথ্যা আছে। বিভ্রান্তি আছে। আরাশ যখন কথা বলত না, তখন সে কি বেশি সুখী ছিল?
আমি আরাশের চোখের দিকে তাকালাম। সেই চোখে এখনও সেই নিষ্পাপতা আছে। কিন্তু আজ থেকে সে কথা বলবে। প্রশ্ন করবে। উত্তর চাইবে। আমি কী উত্তর দেবো?
“বাবা, তুমি কেন কাঁদছো?” আরাশ যদি এই প্রশ্ন করে, আমি কী বলবো? বলবো যে আমি খুশিতে কাঁদছি? কিন্তু খুশি আর কান্নার মধ্যে সম্পর্ক কী? এই জটিল আবেগ আমি কীভাবে একটা শিশুকে বোঝাবো?
হ্যাপি আরাশকে কোলে নিল। আরাশ এবার বলল, “মা।” হ্যাপিও কেঁদে ফেলল। আরাশ আজ আমাদের দুজনকেই নাম দিয়েছে। “বাবা” আর “মা।” কিন্তু এই নামগুলো কি আমাদের পরিচয়, নাকি আমাদের দায়িত্ব?
আমি ভাবলাম—আরাশ যখন “বাবা” বলেছে, তখন সে কি আমাকে ডেকেছে, নাকি আমাকে তৈরি করেছে? এই শব্দটা বলার আগে আমি কি বাবা ছিলাম? হয়তো ছিলাম কাগজে-কলমে। কিন্তু সত্যিকারের বাবা হলাম আজ—যখন আমার সন্তান আমাকে “বাবা” বলে ডাকল।
এই যে ভাষা, এটা কি আমাদের জোড়া দেয়, নাকি আলাদা করে? আরাশ যখন কথা বলত না, তখন আমরা তার সাথে ইশারায়, স্পর্শে, চোখের ভাষায় কথা বলতাম। সেটা কি বেশি সত্যিকারের ছিল?
কিন্তু আজ আরাশ “বাবা” বলেছে। এই শব্দটা শুনে আমার মনে হয়েছে—আমি সত্যিকারের বাবা হয়েছি। এর আগে আমি শুধু একজন মানুষ ছিলাম যার একটা সন্তান ছিল। কিন্তু আজ আমি “বাবা” হলাম।
আরাশ আমার দিকে তাকিয়ে আবার বলল, “বাবা।” এবার অন্য টোনে। যেন সে পরীক্ষা করছে—এই শব্দটা বললে কী হয়? আমি হাসি? কাঁদি? খুশি হই?
আমি বুঝলাম—আরাশ এইমাত্র ভাষার ক্ষমতা আবিষ্কার করেছে। সে জেনেছে যে শব্দ দিয়ে মানুষের মন নিয়ন্ত্রণ করা যায়। “বাবা” বললে বাবা খুশি হয়। “মা” বললে মা কাঁদে।
কিন্তু এই ক্ষমতা কি ভালো? আরাশ এখন জানে যে কথা বলে সে আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এটা কি তার জন্য বোঝা হবে? নাকি স্বাধীনতা?
আমি আরাশকে আবার কোলে নিলাম। তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আরাশ।” সে আমার মুখের দিকে তাকাল। আমি আবার বললাম, “আরাশ।” সে হাসল। যেন বুঝতে পারল—এটা তার নাম।
কিন্তু নাম কী? শুধু একটা শব্দ? নাকি পরিচয়? আরাশ কি জানে যে সে “আরাশ”? নাকি সে শুধু জানে যে এই শব্দটা শুনলে মানুষজন তার দিকে তাকায়?
হ্যাপি বলল, “আরাশ এখন আমাদের সাথে কথা বলতে পারবে।” আমি বললাম, “কিন্তু আমরা কি তার সাথে কথা বলতে পারবো?” “মানে?” “আমাদের ভাষা কি তার উপযুক্ত? আমরা যা বলি, সে কি বুঝবে?”
এই যে আরাশ আজ কথা বলতে শুরু করেছে, এটা একটা শুরু। কিন্তু কীসের শুরু? যোগাযোগের? নাকি ভুল বোঝাবুঝির? প্রেমের? নাকি দূরত্বের?
আমার মনে পড়ল বাবার কথা। বাবা যখন মারা গেলেন, তখন আমার খুব ইচ্ছে হয়েছিল তার সাথে আরেকবার কথা বলার। কিন্তু আজ আরাশ যখন প্রথম কথা বলল, আমার মনে হল—এই কথাগুলো একদিন শেষ হয়ে যাবে। আরাশও একদিন চলে যাবে। আমিও চলে যাবো।
তাহলে এই প্রথম কথার মানে কী? এটা কি একটা শুরু, নাকি একটা গণনা শুরু? আরাশ যতদিন আমার সাথে থাকবে, ততদিন আমরা কথা বলবো। তারপর…?
কিন্তু আমি এই নেতিবাচক চিন্তা ঝেড়ে ফেললাম। আজকের এই মুহূর্তটা আনন্দের। আরাশ কথা বলেছে। সে আমাকে “বাবা” বলেছে। এই একটা শব্দেই আমার জীবনের অর্থ পাল্টে গেছে।
আমি আরাশকে জড়িয়ে ধরলাম। হ্যাপিকেও। আমার মনে হল—এই তিনজন মিলেই আমাদের ছোট্ট পৃথিবী। এই পৃথিবীতে এখন ভাষা এসেছে। কথা এসেছে। যোগাযোগ এসেছে।
আরাশ আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে আবার বলল, “বাবা।” এবার ফিসফিসিয়ে। যেন একটা গোপন কথা বলছে। আমার মনে হল—এই শব্দটা শুধু আমার জন্য। পৃথিবীর আর কারো জন্য নয়।
আমি চোখ বন্ধ করে সেই শব্দটা মনে রাখার চেষ্টা করলাম। আরাশের গলার স্বর। তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা। তার ছোট্ট হাতের স্পর্শ। এই মুহূর্তটা আমি ভুলতে চাই না।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই “বাবা” শব্দটা কি আরাশের ভালোবাসার প্রকাশ? নাকি শুধু একটা শব্দ যা সে শিখেছে? ভালোবাসা কি ভাষায় প্রকাশ করা যায়? নাকি ভালোবাসা ভাষার চেয়ে বড়?
আমি জানি না। কিন্তু আমি জানি যে আজ আরাশ যখন “বাবা” বলেছে, তখন আমার মনে হয়েছে—আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষ। কারণ একটা শিশু আমাকে “বাবা” বলে ডেকেছে।
এই ডাকটা হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি। একটা নতুন জীবন আমাকে তার বাবা বলে মেনে নিয়েছে।
আর এটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় আবেগ—যখন তোমার সন্তান প্রথম তোমাকে “বাবা” বলে ডাকে।
একটু ভাবনা রেখে যান