ব্লগ

প্রথম স্বীকারোক্তি

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ হ্যাপির সাথে বিয়ের পনেরো বছর পূর্ণ হলো। সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে চা খাচ্ছি দুজনে। আরাশ বন্ধুদের সাথে খেলতে গেছে। আমরা একা।

হ্যাপি বলল, “মনে আছে প্রথম কবে বলেছিলে ভালোবাসি?” আমি চা-এর কাপে চুমুক দিলাম। মনে আছে। কীভাবে ভুলবো?

সেই দিনটার কথা মনে পড়তেই আমার বুকের ভেতর একটা কাঁপুনি খেলে গেল। আজও। পনেরো বছর পরেও।

“বলবো?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। হ্যাপি মাথা নাড়ল।

আমি চোখ বন্ধ করে ফিরে গেলাম সেই দিনে। ষোল বছর আগে। আমরা তখন কলেজে। হ্যাপি আমার ক্লাসমেট। আমি তাকে ভালোবাসি—এটা জানতাম। কিন্তু বলতে পারিনি।

কত মাস ধরে ভেবেছি। কীভাবে বলবো? কী বলবো? যদি না বলে? যদি হেসে ফেলে? যদি আমাদের বন্ধুত্বটাও শেষ হয়ে যায়?

সেই দিন ছিল শীতের সকাল। কলেজের ছাদে দাঁড়িয়ে ছিলাম একা। হ্যাপি এসে পাশে দাঁড়াল। “কী ভাবছো?” সে জিজ্ঞেস করল।

আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। গলা শুকিয়ে গেল। হাত কাঁপতে লাগল। আমি বললাম, “তোমার কথা।”

হ্যাপি আমার দিকে তাকাল। তার চোখে কৌতূহল। “আমার কী কথা?”

আমি গভীর নিঃশ্বাস নিলাম। মনে মনে বললাম—এখনই বা কখনো না। “আমি… আমি তোমাকে…” কথা আটকে গেল।

“কী?” হ্যাপি এগিয়ে এলো।

“আমি তোমাকে ভালোবাসি।”

এই চারটা শব্দ বলার সাথে সাথে আমার মনে হলো—পৃথিবী থেমে গেছে। সময় থেমে গেছে। আমার নিজের কণ্ঠস্বর অন্যরকম শোনাল।

হ্যাপি চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কয়েক সেকেন্ড। কিন্তু আমার কাছে মনে হলো—যুগ যুগ।

“তুমি নিশ্চিত?” সে জিজ্ঞেস করল।

আমি মাথা নাড়লাম। “হ্যাঁ। আমি এর চেয়ে নিশ্চিত আর কোনো কিছু নিয়ে নই।”

হ্যাপি হাসল। সেই হাসিতে লজ্জা, আনন্দ, আর কিছুটা অবিশ্বাস মেশানো।

“আমিও,” সে বলল।

আমি ঠিক শুনতে পেলাম কি না সন্দেহ হলো। “মানে?”

“আমিও তোমাকে ভালোবাসি।”

এই কথা শুনে আমার পা যেন মাটি ছেড়ে গেল। আমি ভাসছি। আকাশে ভাসছি। মেঘের ওপর দিয়ে হাঁটছি।

কিন্তু এরপর কী করতে হয় জানতাম না। সিনেমায় দেখেছি—এই সময় গান হয়। কিন্তু বাস্তবে? আমরা দুজনেই লজ্জায় চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

“এখন কী হবে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“জানি না,” হ্যাপি বলল। “তুমি কী চাও?”

আমি বললাম, “তোমাকে চাই। সারা জীবনের জন্য।”

হ্যাপি আমার হাত ধরল। তার হাত ঠাণ্ডা। আমার হাত গরম। দুটো মিলে একটা পারফেক্ট তাপমাত্রা।

“আমিও তোমাকে চাই,” সে বলল।

সেই মুহূর্তে আমার মনে হলো—এই পৃথিবীতে আমার চেয়ে ভাগ্যবান কেউ নেই। আমি যাকে ভালোবাসি, সেও আমাকে ভালোবাসে। এর চেয়ে বড় অলৌকিক ঘটনা আর কী হতে পারে?

আমরা সেদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছিলাম। ভবিষ্যতের স্বপ্ন। বিয়ের পরিকল্পনা। সংসারের কথা। সব কিছু এত সহজ লাগছিল।

“হায়দার,” হ্যাপি এখন বলল। “তোমার গল্প শেষ?”

আমি চোখ খুললাম। “হ্যাঁ। আর মনে আছে তোমার?”

“সব মনে আছে। সেই দিনের সেই অনুভূতিও।”

আমি হ্যাপির হাত ধরলাম। আজও সেই একই হাত। একটু কুঁচকে গেছে। কিন্তু স্পর্শ একই।

“আমি এখনো তোমাকে ভালোবাসি,” আমি বললাম।

“আমিও,” হ্যাপি বলল।

কিন্তু এখনকার ভালোবাসা আলাদা। তখনকার ভালোবাসায় রোমাঞ্চ ছিল। এখনকার ভালোবাসায় আছে গভীরতা। তখন আমরা ভালোবাসার স্বপ্ন দেখতাম। এখন ভালোবাসা নিয়ে বাঁচি।

আরাশ দৌড়ে এসে বলল, “আব্বু, আম্মু, কী করছো?”

“কথা বলছি,” আমি বললাম।

“কী কথা?”

“তোমার জন্মের আগের কথা।”

আরাশ কৌতূহলী হয়ে বসল। “কী কথা?”

হ্যাপি বলল, “তোমার আব্বু আমাকে প্রথম কবে ভালোবাসার কথা বলেছিল।”

আরাশ হেসে ফেলল। “তোমরা এখনো সেই কথা বলো?”

আমি বললাম, “হ্যাঁ। কিছু কথা বারবার বলতে ভালো লাগে।”

সত্যিই ভালো লাগে। সেই প্রথম স্বীকারোক্তির কথা মনে করতে। সেই রোমাঞ্চের কথা মনে করতে। যখন আমি জানতাম না হ্যাপি কী বলবে। যখন সব কিছু অনিশ্চিত ছিল।

এখন সব নিশ্চিত। আমরা একসাথে আছি। পনেরো বছর ধরে। একটা ছেলে আছে। একটা সংসার আছে।

কিন্তু সেই প্রথম দিনের রোমাঞ্চ এখনো মনে আছে। এখনো কখনো কখনো অনুভব করি। যখন হ্যাপি অপ্রত্যাশিতভাবে হাসে। যখন সে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে—”তুমি আমার।”

প্রেমের প্রথম স্বীকারোক্তি হয়তো একবারই ঘটে। কিন্তু সেই রোমাঞ্চ সারা জীবন বয়ে নিয়ে চলতে হয়।

আর সেটাই ভালোবাসার সবচেয়ে বড় উপহার।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *