ব্লগ

প্রথম ভাঙন

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ বিকেলে আরাশের কান্নার আওয়াজে ঘরে ছুটে গেলাম। দেখি তার প্রিয় robot খেলনাটা মেঝেতে পড়ে আছে। দুই টুকরো হয়ে গেছে।

“কী হয়েছে?”

“বাবা, আমার রোবট ভেঙে গেছে।” কান্নায় ভেঙে পড়ল আরাশ।

আমি খেলনাটা তুলে দেখলাম। সাধারণ একটা প্লাস্টিকের রোবট। দোকানে গেলে আরো ভালো পাওয়া যাবে। কিন্তু আরাশের কাছে এটা ছিল তার best friend।

“নতুন একটা কিনে দেব।”

“না বাবা। আমি এইটাই চাই। এইটা আমার সাথে কত দিন খেলেছে।”

আমার ভিতরে একটা অ্যাপ খুলে গেল যার নাম “প্রথম ক্ষতির পাঠশালা ভার্সন শৈশব”।

আমার মনে পড়ল আমার ছোটবেলার কথা। আমার একটা লাল গাড়ির খেলনা ছিল। নানার কাছ থেকে পাওয়া। সেটা ভেঙে গেলে আমিও এমনি কেঁদেছিলাম। বাবা বলেছিলেন, “এটা শুধু একটা খেলনা।” কিন্তু আমার কাছে সেটা ছিল আমার পৃথিবী।

আরাশকে কোলে নিয়ে বসলাম। “তুই এই রোবটকে এত ভালোবাসিস কেন?”

“বাবা, আমি যখন একা থাকি, তখন ওর সাথে কথা বলি। ও আমার গল্প শোনে। ও আমার বন্ধু।”

হ্যাপি এসে বলল, “আরাশ, নতুন একটা…”

আমি হ্যাপিকে থামিয়ে দিলাম। বুঝলাম, এখানে রোবট বদলানোর বিষয় নয়। এখানে আরাশ তার জীবনের প্রথম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

“আরাশ, তুই জানিস সব জিনিস একদিন ভেঙে যায়?”

“কেন বাবা?”

“এটাই জীবনের নিয়ম। কিন্তু সেজন্য কি আমরা কিছু ভালোবাসা বন্ধ করে দেব?”

আরাশ মাথা নাড়ল।

“তোর রোবটটা ভেঙে গেছে। কিন্তু তোর যে memories আছে ওর সাথে, সেগুলো কি ভাঙবে?”

“না।”

“তাহলে তোর বন্ধু আসলে মরেনি। ও তোর মনে বেঁচে আছে।”

আরাশ একটু থেমে বলল, “বাবা, কিন্তু আমি আর ওর সাথে খেলতে পারব না।”

“না। কিন্তু তুই অন্য কিছু ভালোবাসতে পারবি। আর সেটা ভালোবাসতে ভয় পাবি না।”

রাতে হ্যাপির সাথে কথা বলছিলাম। “আরাশের এই প্রথম heartbreak।”

“হ্যাঁ। এখন থেকে সে জানবে ক্ষতি কী।”

“এটা কি ভালো নাকি মন্দ?”

হ্যাপি বলল, “হায়দার, এটা জীবনের অংশ। আরাশ যদি ছোট ক্ষতি সহ্য করতে না শেখে, তাহলে বড় ক্ষতির সময় ভেঙে পড়বে।”

পরদিন আরাশকে দেখলাম সে তার ভাঙা রোবটটা একটা বাক্সে রেখেছে। “কী করছিস?”

“বাবা, আমি ওকে ফেলে দেব না। ওর সাথে আমার অনেক স্মৃতি।”

আমি বুঝলাম আরাশ তার প্রথম পাঠ শিখে নিয়েছে। ভালোবাসা হারিয়ে গেলেও স্মৃতি থেকে যায়।

নামাজ পড়ে ভাবছিলাম। আল্লাহ আমাদের ছোট ছোট ক্ষতির মাধ্যমে বড় ক্ষতির জন্য প্রস্তুত করেন। আমার বাবার মৃত্যুর সময় যে ব্যথা পেয়েছিলাম, সেটা সহ্য করতে পেরেছিলাম কারণ ছোটবেলা থেকেই ছোট ছোট হারানোর অভিজ্ঞতা ছিল।

আরাশকে বললাম, “তুই যখন বড় হবি, তখনও কিছু না কিছু হারাবি। কিন্তু মনে রাখিস – হারানো মানে শেষ হয়ে যাওয়া নয়। মানে নতুন করে ভালোবাসা শেখা।”

এক সপ্তাহ পর দেখলাম আরাশ একটা নতুন robot দিয়ে খেলছে। কিন্তু পুরনো রোবটটার বাক্স তার টেবিলেই রাখা।

“নতুন বন্ধু?”

“হ্যাঁ বাবা। কিন্তু পুরনো বন্ধুর কথাও ভুলিনি।”

প্রথম ভাঙা খেলনা আমাদের শেখায় যে জীবনে কিছুই চিরস্থায়ী নয়। কিন্তু ভালোবাসা চিরস্থায়ী। সেটা রূপ বদলায়, কিন্তু মরে না।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

ব্লগ

আয়না

নভেম্বর ২০২৫ · 9 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *