আজ সকালে চা নাকি কফি খাবো—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্তে হঠাৎ ভাবলাম: এই একটা ছোট সিদ্ধান্তে কি আমার জীবন দুভাগে ভেঙে যাচ্ছে?
বিজ্ঞানের বইতে পড়েছি—কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুযায়ী প্রতিটি সম্ভাবনা একসাথে ঘটে। তারপর আমাদের পর্যবেক্ষণে একটা বাস্তব হয়ে ওঠে।
তাহলে কি এই মুহূর্তে একটা মহাবিশ্বে আমি চা খাচ্ছি, আরেকটায় কফি? দুটো হায়দার, দুটো সিদ্ধান্ত, দুটো ভবিষ্যৎ?
চা নিয়ে বসলাম। কিন্তু মনে হল—কোথাও আরেকজন আমি কফি খেয়ে অন্য রকম দিন শুরু করেছে।
হ্যাপি বলল, “কী ভাবছো?”
“ভাবছি—আমি যে চা খেলাম, এটা কি একমাত্র সম্ভাবনা ছিল?”
“আবার শুরু করেছো?”
আমি বললাম, “না শোনো। যদি প্রতিটি সিদ্ধান্তে জগৎ ভাগ হয়ে যায়, তাহলে আমার প্রতিটি পছন্দ আসলে অসংখ্য আমি তৈরি করছে।”
হ্যাপি হাসল। “তাহলে কোন আমি আসল?”
এই প্রশ্নে আমি থমকে গেলাম। সত্যিই তো। যদি অসংখ্য সমান্তরাল আমি থাকে, তাহলে কোনটা ‘আসল’ হায়দার?
আরাশ এসে বলল, “বাবা, আজ স্কুলে যাবো না।”
“কেন?”
“গলা ব্যথা।”
আমি তার কপালে হাত দিলাম। জ্বর নেই। কিন্তু সে একটু দুর্বল লাগছে।
এখানে একটা সিদ্ধান্ত। আমি তাকে স্কুলে পাঠাবো নাকি বাসায় রাখবো?
যদি স্কুলে পাঠাই—একটা টাইমলাইন। যদি বাসায় রাখি—আরেকটা টাইমলাইন।
প্রতিটি টাইমলাইনে আলাদা ঘটনা। আলাদা পরিণতি। আলাদা আরাশ।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—বাসায় রাখবো।
কিন্তু ভাবলাম—কোনো এক মহাবিশ্বে আমি তাকে স্কুলে পাঠিয়েছি। সেখানে কী ঘটছে? সে কি অসুস্থ হয়ে পড়েছে? নাকি ভালোই আছে?
দুপুরে আরাশ ভালো হয়ে গেল। খেলতে শুরু করল। আমার সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল।
কিন্তু ঐ অন্য মহাবিশ্বের হায়দার কি অনুশোচনা করছে?
আমি ভাবলাম—যদি প্রতিটি সিদ্ধান্তে অসংখ্য আমি তৈরি হয়, তাহলে আমার দায়িত্ব কী? আমি কি শুধু এই একটা জীবনের জন্য দায়ী? নাকি সব সমান্তরাল জীবনের জন্য?
সন্ধ্যায় অফিসে ফোন এলো। ইন্টারভিউ কল। কাল সকাল দশটায়।
আমি ‘হ্যাঁ’ বললাম।
কিন্তু যে মুহূর্তে ‘হ্যাঁ’ বললাম, কোথাও আরেকজন আমি ‘না’ বলল। কোথাও আরেকজন আমি ফোনটাই ধরল না।
অসংখ্য সম্ভাবনা। অসংখ্য হায়দার।
রাতে শুয়ে ভাবলাম—আমার এই চিন্তাভাবনাও কি অসংখ্য মহাবিশ্ব তৈরি করছে? কোথাও আমি এই প্রশ্ন করছি না। কোথাও আমি ভিন্ন প্রশ্ন করছি।
কোথাও হয়তো আমি একজন পদার্থবিজ্ঞানী হয়েছি। এই কোয়ান্টাম রহস্য নিয়ে কাজ করছি।
কোথাও হয়তো আমি এই বিষয়ে কিছুই জানি না। সাধারণ জীবন যাপন করছি।
কিন্তু কোন জীবনটা ‘সঠিক’?
হয়তো সবগুলোই সঠিক। প্রতিটি সিদ্ধান্ত একটা নতুন সত্য তৈরি করে।
তাহলে আমার স্বাধীন ইচ্ছা কী? আমি যদি প্রতিটা সম্ভাবনাই বেছে নিই বিভিন্ন মহাবিশ্বে, তাহলে পছন্দের মানে কী?
হয়তো মানে হলো—আমি যে মহাবিশ্বে আছি, সেখানে আমার সিদ্ধান্তের ফলাফল ভোগ করা।
পরদিন ইন্টারভিউতে গেলাম। ভালো হলো।
কিন্তু ভাবলাম—কোনো মহাবিশ্বে আমি যাইনি। কোনোটায় খারাপ হয়েছে। কোনোটায় আরো ভালো হয়েছে।
ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে করতে বুঝলাম—এই অপেক্ষাও অসংখ্য রূপে ঘটছে। কোথাও আমি আত্মবিশ্বাসী। কোথাও হতাশ। কোথাও উদাসীন।
কিন্তু এই উপলব্ধি আমাকে একটা শান্তি দিল।
যদি সব সম্ভাবনাই ঘটে, তাহলে আমার কোনো সিদ্ধান্তই ‘ভুল’ নয়। প্রতিটি সিদ্ধান্ত কোনো না কোনো মহাবিশ্বে সঠিক।
আমি চাকরি পাই বা না পাই, দুটোই কোথাও না কোথাও ঘটছে।
তাহলে আমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
আমি যা-ই করি না কেন, কোথাও না কোথাও একজন হায়দার সফল হচ্ছে। কোথাও একজন ব্যর্থ হচ্ছে। কোথাও একজন মধ্যম পথ খুঁজে নিচ্ছে।
তাহলে আমার করণীয় কী?
আমি বুঝলাম—আমার করণীয় হলো এই মহাবিশ্বে, এই টাইমলাইনে সবচেয়ে ভালো হায়দার হওয়ার চেষ্টা করা।
কারণ অন্য সব হায়দারের দায়িত্ব অন্য সব হায়দারের। আমার দায়িত্ব শুধু এই হায়দারের।
আর এই হায়দার চায়—তার পরিবার ভালো থাকুক। সে সৎ থাকুক। সে চেষ্টা করে যাক।
বাকি সব কোয়ান্টাম সম্ভাবনা তাদের নিজেদের পথে চলুক।
আমি আমার পথে চলবো।
একটু ভাবনা রেখে যান