বাবা মারা গেলেন যখন আমার বয়স কুড়ি।
হাসপাতাল থেকে ফিরে বাড়িতে ঢুকলাম। মা বসে আছেন। চোখ ফাঁকা।
চাচা বললেন, “এখন তোমাকেই সব সামলাতে হবে।”
আমি চুপ করে রইলাম।
“বুঝেছ?”
“হ্যাঁ।”
“পারবে?”
মায়ের দিকে তাকালাম। তিনি আমার দিকে তাকালেন না।
“পারব।”
সেই রাতে ছাদে গিয়ে বসেছিলাম। একা। আকাশে তারা ছিল না। মেঘ ছিল।
মনে মনে বললাম, পারব।
জানতাম না এই একটা শব্দ আমাকে বদলে দেবে।
পরের বছরগুলোতে আমি পারতে থাকলাম।
মায়ের ওষুধ কিনলাম। বাড়ির ভাড়া দিলাম। বোনের পড়াশোনার খরচ জোগালাম।
কেউ জিজ্ঞেস করেনি আমি কেমন আছি। আমিও বলিনি।
একদিন সাইফুল বলল, “তুই তো একদম বদলে গেছিস।”
“কীভাবে?”
“আগে তো তুই অনেক হাসতিস।”
“এখনো হাসি।”
“না। এখন তুই হাসির মতো কিছু একটা করিস। হাসি না।”
চুপ করে রইলাম।
হ্যাপির সাথে বিয়ের আগে তার বাবা বললেন, “মেয়েকে ভালো রাখবে তো?”
“রাখব।”
“ও একটু আবেগী। বুঝে চলবে।”
“বুঝব।”
বিয়ের পর হ্যাপি একদিন বলল, “তুমি কখনো রাগ করো না কেন?”
“রাগ হয় না।”
“সবার রাগ হয়।”
“আমার হয় না।”
সে অবাক হয়ে তাকাল।
সেই রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবলাম, আমার কি সত্যিই রাগ হয় না? নাকি আমি রাগ করতে ভুলে গেছি?
অফিসে বস ডাকলেন।
“বসো।”
বসলাম।
“তোমার উপর আমাদের খুব আশা।”
“ধন্যবাদ।”
“এই প্রজেক্টটা তোমাকেই সামলাতে হবে।”
“অবশ্যই।”
“পারবে?”
সেই পুরনো শব্দটা আবার এলো।
“পারব।”
বেরিয়ে এসে বাথরুমে গেলাম। আয়নায় তাকালাম।
লোকটা হাসছে। কিন্তু চোখদুটো হাসছে না।
আরাশ জন্মানোর পর নতুন কিছু শুরু হলো।
হ্যাপির মা বললেন, “বাবা হওয়া সহজ না। ধৈর্য রাখতে হবে।”
“রাখব।”
“সবসময় সময় দিতে হবে।”
“দেব।”
“কখনো বিরক্ত হওয়া যাবে না।”
“হব না।”
আরাশ বড় হতে লাগল। সে প্রশ্ন করতে শিখল।
“বাবা, আকাশ নীল কেন?”
“আলোর কারণে।”
“আলো কী?”
“যেটা দিয়ে আমরা দেখি।”
“দেখা কী?”
“চোখ দিয়ে যা করি।”
“চোখ কী?”
আমি উত্তর দিতে থাকলাম। ধৈর্য ধরে। হাসি মুখে।
কিন্তু মাথার ভেতর কেউ চিৎকার করছিল। চুপ করো। একটু চুপ করো।
সেই চিৎকারটা কার ছিল?
একদিন আরাশ বলল, “বাবা, তুমি ক্লান্ত?”
“না তো।”
“তোমার চোখ লাল।”
“ঘুম কম হয়েছে।”
“কেন?”
“কাজ ছিল।”
“তুমি সবসময় কাজ করো।”
কিছু বললাম না।
“তুমি কি আমার সাথে খেলতে চাও না?”
“চাই তো।”
“তাহলে চলো।”
উঠলাম। তার সাথে খেলতে গেলাম।
খেলার সময় হাসলাম। দৌড়ালাম। লাফালাম।
কিন্তু মাথার ভেতর সেই কণ্ঠস্বর বলছিল—তুমি অভিনয় করছ।
সাইফুল একদিন বলল, “তুই কি কখনো না বলিস?”
“কীসে?”
“কেউ কিছু চাইলে। তুই কি কখনো না বলিস?”
ভাবলাম।
“বলি তো।”
“কবে বলেছিস?”
চুপ করে রইলাম।
“দেখ,” সে বলল, “তুই সবার কথা শুনিস। সবার জন্য করিস। তোর নিজের কী?”
“নিজের মানে?”
“তুই কী চাস?”
চা এলো। চুমুক দিলাম। ঠান্ডা হয়ে গেছে।
“জানি না।”
হ্যাপি একদিন রাতে বলল, “তুমি কি আমার সাথে খুশি?”
“হ্যাঁ।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি তো সবকিছুতেই হ্যাঁ বলো।”
চুপ করে রইলাম।
“আমি যদি বলি ছাদ থেকে লাফ দাও, তুমি কি হ্যাঁ বলবে?”
“বোকা বোকা কথা বলো না।”
“দেখো, এইমাত্র তুমি না বললে।”
সে হাসল। আমি হাসলাম না।
বাবু ফোন করল।
“কেমন আছিস?”
“ভালো।”
“মিথ্যা বলছিস।”
“কেন মিথ্যা হবে?”
“তোর গলার স্বর বলছে।”
চুপ করে রইলাম।
“কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
“আমাকে বলতে পারিস।”
“কিছু হয়নি।”
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“তুই এমন কেন?”
“কেমন?”
“সবকিছু একা সামলাতে চাস।”
সেই রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবলাম।
কুড়ি বছর বয়সে আমি বলেছিলাম “পারব”। তারপর থেকে আমি পারতেই থাকলাম।
সবার জন্য। সব কিছুতে।
কিন্তু কোথাও একটা জায়গায় সেই কুড়ি বছরের ছেলেটা রয়ে গেল। যে পারত না। যে ভয় পেত। যে কাঁদতে চাইত।
সে কোথায়?
পরদিন অফিসে বস বললেন, “আরেকটা প্রজেক্ট আসছে।”
“আমাকে দিন।”
“তুমি তো ইতিমধ্যে তিনটা সামলাচ্ছ।”
“পারব।”
তিনি একটু থামলেন।
“তুমি কি কখনো না বলো?”
আমি হাসলাম।
“বলি তো।”
“কবে?”
বাড়ি ফিরে আরাশকে দেখলাম সোফায় বসে আছে।
“বাবা!”
“হুম।”
“তুমি কি ক্লান্ত?”
“না।”
“তুমি সবসময় না বলো।”
“কীসে?”
“আমি জিজ্ঞেস করি তুমি ক্লান্ত কি না। তুমি বলো না। কিন্তু তোমার চোখ বলে হ্যাঁ।”
তার দিকে তাকালাম।
“তুমি কি বুঝতে পারো?”
“পারি।”
“কীভাবে?”
“জানি না। পারি।”
সেই রাতে হ্যাপিকে বললাম, “আমি ক্লান্ত।”
সে থমকে গেল।
“কী বললে?”
“ক্লান্ত। আমি ক্লান্ত।”
সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
“তুমি তো কখনো…”
“জানি। বলি না। আজ বললাম।”
সে কাছে এলো। আমার পাশে বসল।
“আর কী?”
“আর কী মানে?”
“আর কী বলতে চাও?”
চুপ করে রইলাম।
“বলো।”
“জানি না।”
পরদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম।
শেভ করছি।
আরাশ এলো।
“বাবা।”
“হুম।”
“তুমি আজ অন্যরকম।”
“কীরকম?”
“জানি না। অন্যরকম।”
সে চলে গেল।
আমি আয়নায় তাকালাম।
লোকটা তাকিয়ে আছে। ফোম মুখে। ব্লেড হাতে।
কে এই লোক?
যে সবসময় পারে? নাকি যে পারে না কিন্তু বলতে পারে না?
জানি না।
বাইরে রিকশার ঘণ্টা। কেউ যাচ্ছে কোথাও।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
একটু ভাবনা রেখে যান