ব্লগ

উপহারের প্রত্যাশার মধুরতা

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

“তোমার জন্য কিছু এনেছি।” এই কথাটা শুনলেই আমার ভিতরে একটা ছোট বাচ্চা জেগে ওঠে। ৩৯ বছর বয়সেও এই উত্তেজনা কমেনি। হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। চোখে একটা চকচকে ভাব আসে। যেন আমি আবার সেই সাত বছরের বাচ্চা হয়ে গেছি।

আজ হ্যাপি বলল এই কথা। সন্ধ্যায় বাজার থেকে ফিরে এসে। আমি তখন সোফায় শুয়ে টিভি দেখছিলাম। তার কথা শুনে লাফিয়ে বসলাম। “কী এনেছ?” প্রশ্নটা করার সাথে সাথেই মনে হল, আমি কত বাচ্চা ধরনের ব্যবহার করছি।

কিন্তু এই ব্যবহারে লজ্জার কিছু নেই। উপহার পাওয়ার আনন্দ বয়সের সাথে কমে না। বরং বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই আনন্দ আরো বিশুদ্ধ হয়ে ওঠে। কারণ আমরা বুঝি যে কেউ আমাদের জন্য ভেবেছে।

আরাশ দেখল আমার উত্তেজনা। হাসতে হাসতে বলল, “আব্বু, আপনি একদম বাচ্চাদের মতো হয়ে গেছেন।” আমি বললাম, “উপহার পেলে সবাই বাচ্চা হয়ে যায়।” এবং এটা সত্যি।

হ্যাপি ব্যাগ থেকে একটা বই বের করল। আমার পছন্দের একটা লেখকের নতুন বই। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। “তুমি কীভাবে জানলে এই বই আমার চাই?” সে হাসল, “তুমি গত সপ্তাহে বলেছিলে।”

আমার মনে নেই যে আমি বলেছিলাম। কিন্তু হ্যাপি মনে রেখেছে। আমার ছোট্ট একটা ইচ্ছার কথা মনে রেখে তার জন্য কিছু কিনে এনেছে। এই ভালোবাসাটুকুই তো আসল উপহার।

ছোটবেলায় বাবা যখন কোথাও যেতেন, ফেরার সময় বলতেন, “তোদের জন্য কিছু এনেছি।” তখন আমি আর আমার ভাইবোনেরা দৌড়ে যেতাম তার কাছে। কী এনেছেন দেখতে। মাঝে মাঝে ছোট্ট চকলেট, কখনো পেন্সিল। খুব দামী কিছু নয়। কিন্তু সেই আনন্দ ছিল অমূল্য।

এখন আমি যখন আরাশের জন্য কিছু কিনে আনি, তার চোখে সেই একই চকচকানি দেখি। “আব্বু, আমার জন্য কী এনেছেন?” এই প্রশ্নে যে উত্তেজনা, সেটা দেখে আমার নিজের শৈশব মনে পড়ে যায়।

কিন্তু বয়স্কদের ক্ষেত্রে উপহার পাওয়ার অনুভূতি একটু আলাদা। এখানে শুধু জিনিসটা নয়, এর পেছনের চিন্তাটাই মূল বিষয়। কেউ আমার কথা ভেবেছে। আমার পছন্দ-অপছন্দ মনে রেখেছে।

আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি যে আমার জীবনে এমন মানুষ আছে যারা আমার জন্য ভাবে। যারা আমার ছোট ছোট ইচ্ছের কথা মনে রাখে।

অফিসে সহকর্মী জামিউর মাঝে মাঝে কিছু এনে দেয়। গত সপ্তাহে একটা কলম এনেছিল। বলেছিল, “তোর কলম শেষ হয়ে গেছে দেখলাম।” এত ছোট্ট একটা বিষয় সে খেয়াল রেখেছে।

এই ছোট ছোট উপহারগুলো জীবনকে মধুর করে তোলে। দামের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। একটা ৫ টাকার চকলেটেও সেই একই আনন্দ।

কখনো কখনো নিজেকে প্রশ্ন করি, “আমি কি অন্যদের জন্য এভাবে ভাবি?” আমি কি হ্যাপির জন্য, আরাশের জন্য, পরিবারের জন্য এমন ছোট ছোট সারপ্রাইজ করি?

আজ সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আগামীকাল আরাশের জন্য কিছু কিনে নিয়ে আসব। তার চোখে যে আনন্দ দেখব, সেটাই হবে আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

উপহার দেওয়া আর পাওয়া – এই দুটোই জীবনের সুন্দর অংশ। কিন্তু দেওয়ার আনন্দ পাওয়ার আনন্দের চেয়ে বেশি। আজ সেটা উপলব্ধি করলাম।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *