আজ আদালতে একটি জমিজমার বিষয়ে সাক্ষী দিতে গিয়েছিলাম। ওকিল সাহেব বললেন, “হায়দার ভাই, আপনার সাথে আরেকজন পুরুষ সাক্ষী লাগবে। আর যদি মহিলা সাক্ষী হয়, তাহলে দু’জন।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?”
“ইসলামী আইনে মেয়েদের সাক্ষ্য অর্ধেক। কুরআনে লেখা আছে।”
বাসায় ফিরে কুরআন খুলে দেখলাম সেই আয়াত (বাকারা ২:২৮২)। কিন্তু পুরো আয়াতটা পড়ে অবাক হলাম। এই আয়াতটি শুধুমাত্র ঋণের লেনদেনের ক্ষেত্রে।
আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমরা যখন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণের কারবার করো, তখন তা লিখে রাখো… এবং তোমাদের পুরুষদের মধ্য থেকে দু’জন সাক্ষী রাখো। যদি দু’জন পুরুষ না পাও, তাহলে একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলা – যাদের তোমরা সাক্ষী হিসেবে পছন্দ কর – যেন একজন ভুলে গেলে অন্যজন তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।”
এখানে মূল কারণ বলা হয়েছে “যেন একজন ভুলে গেলে অন্যজন স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।” এটা মানসিক দুর্বলতার জন্য নয়, বরং সেই যুগে মহিলারা ব্যবসায়িক লেনদেনে কম অভিজ্ঞ ছিলেন বলে।
আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় – এই নিয়ম শুধুমাত্র আর্থিক লেনদেনের জন্য। অন্য ক্ষেত্রে নয়।
কুরআনে আরো দেখলাম:
লি’আন (স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অভিযোগ) এর ক্ষেত্রে (নূর ২৪:৬-৯) – স্ত্রী ও স্বামীর সাক্ষ্য সমান।
কসম ভাঙার কাফফারার ক্ষেত্রে – পুরুষ ও নারীর সাক্ষ্য সমান।
তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দত গণনায় – নারীর সাক্ষ্যই প্রধান।
হ্যাপিকে বললাম এসব কথা। হ্যাপি বলল, “তাহলে যারা সব ক্ষেত্রে মেয়েদের সাক্ষ্য অর্ধেক বলেন, তারা ভুল করছেন?”
রাতে ইন্টারনেটে খোঁজ নিয়ে দেখলাম রসুল (সা) এর যুগের ঘটনা। আইশা (রা) থেকে বর্ণিত অসংখ্য হাদিস এককভাবে গৃহীত হয়েছে। তার সাথে কোনো পুরুষ সাক্ষীর প্রয়োজন হয়নি।
উম্মে সালামা (রা) একাই রসুল (সা) এর অসংখ্য হাদিস বর্ণনা করেছেন।
হাফসা (রা) একা কুরআনের পূর্ণ কপি সংরক্ষণ করেছিলেন।
তাহলে ধর্মীয় বিষয়ে নারীর একক সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য, কিন্তু পার্থিব বিষয়ে নয় – এটা কি যুক্তিসংগত?
আরাশ জিজ্ঞেস করল, “আব্বু, আম্মুর কথার দাম কি তোমার কথার অর্ধেক?”
আমি বললাম, “একদমই না। অনেক ক্ষেত্রে আম্মু আমার চেয়ে ভালো বোঝেন। যেমন তোমার পড়াশোনা, স্বাস্থ্য এগুলো।”
আরো পড়লাম, ইমাম আবু হানিফা (র) এর মতে বিবাহ ও তালাকের ক্ষেত্রে শুধু নারী সাক্ষীও যথেষ্ট। কারণ এগুলো বিশেষভাবে নারীদের বিষয়।
ইমাম ইবন তাইমিয়া (র) বলেছেন, যে বিষয়ে নারীরা বেশি অভিজ্ঞ (যেমন প্রসব, শিশুর জন্ম, স্ত্রীরোগ), সেখানে শুধু নারীর সাক্ষ্যই যথেষ্ট।
তাহলে এই “সব ক্ষেত্রে অর্ধেক সাক্ষ্য” টা কোথা থেকে এলো?
আমি ভাবি, যারা এই ব্যাখ্যা প্রচার করেন, তাদের উদ্দেশ্য কী? তারা কি সত্যিই ইসলামের সেবা করছেন, নাকি নারীদের সামাজিক মর্যাদা কমিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন?
একজন নারী যদি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিচারক হতে পারেন, তাহলে তার সাক্ষ্য কম গ্রহণযোগ্য কেন?
বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবি। আমার হ্যাপি যদি কোনো ঘটনা দেখে, তাহলে তার বর্ণনা কি আমার বর্ণনার চেয়ে কম সত্য?
কুরআনে আল্লাহ বলেছেন (হুজুরাত ৪৯:৬), “তোমরা কোনো খবর যাচাই করে নিও।” এখানে পুরুষ-নারীর কোনো ভেদাভেদ নেই।
হাদিসেও আছে, “যে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়, সে আমার উম্মতের নয়।” এখানেও লিঙ্গভিত্তিক কোনো পার্থক্য নেই।
আমার বিশ্বাস, সত্যিকারের ইসলাম ন্যায়বিচারের উপর প্রতিষ্ঠিত। আর ন্যায়বিচারের জন্য প্রয়োজন সত্য সাক্ষ্য – সেটা পুরুষের হোক বা নারীর।
একটু ভাবনা রেখে যান