ব্লগ

একা কাঁধে পুরো আকাশ

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

সকালে ঘুম থেকে উঠেই মনে হয় একটা পাহাড় আমার কাঁধে চেপে বসেছে। সেই পাহাড়ের নাম দায়িত্ব। পরিবারের তিনটি মানুষের খাওয়া, পরা, থাকার দায়িত্ব।

শুধু আমার একার ওপর।


আমি যখন বিয়ে করি, ভাবিনি এই চাপ এত ভারী হবে। ভেবেছিলাম হ্যাপি আর আমি মিলে সংসার চালাব।

কিন্তু আরাশ হওয়ার পর হ্যাপি ঘরে থাকে। আর আমি একা উপার্জন করি।

প্রতিদিন সকালে বের হওয়ার সময় মনে হয় আমি একটা যুদ্ধে যাচ্ছি। সেই যুদ্ধে আমাকে জিততেই হবে। কারণ আমার পরাজয় মানে আমার পরিবারের খাবার নেই।

এই চাপ আমাকে ঘুমাতে দেয় না। রাতে শুয়ে ভাবি আগামীকাল কাজ পাব কি? এই মাসের বিল দিতে পারব কি? আরাশের স্কুলের ফি দিতে পারব কি?

আমার কোনো ছুটি নেই। অসুখ হলেও কাজে যেতে হয়। কারণ একদিন কাজ না করলে একদিনের আয় কমে যায়।

আমি মাঝে মাঝে ভাবি, অন্য পরিবারে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কাজ করে। তাদের চাপ ভাগ হয়ে যায়। আমার চাপ একা বহন করতে হয়।

হ্যাপি কখনো কখনো বলে, “আমি কাজ করব।”

আমি বলি, “প্রয়োজন নেই। আমি পারছি।”

কিন্তু আসলে আমি পারছি না। আমি শুধু পারার ভান করছি।

আমি হ্যাপিকে কাজ করতে দিতে চাই না কারণ আমি মনে করি পরিবারের দায়িত্ব আমার। এটা আমার পুরুষালি অহংকার।

কিন্তু এই অহংকার আমাকে ক্ষয় করে দিচ্ছে।

আমার বন্ধুরা যখন ছুটিতে কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করে, আমি মনে মনে হিসাব করি। এই টাকা দিয়ে আরাশের দুই মাসের স্কুলের ফি দেওয়া যায়।

আমি নিজের জন্য কিছু কিনতে পারি না। কারণ সেই টাকা পরিবারের অন্য কাজে লাগে।

আমার জামা পুরনো। জুতা ছেঁড়া। কিন্তু আমি নতুন কিনি না। কারণ আরাশের জামা আগে কিনতে হবে।

এই ত্যাগ করতে কষ্ট হয় না। কিন্তু চাপ হয়। লাগাতার চাপ।

আমি যদি অসুস্থ হয়ে পড়ি? আমি যদি কাজ করতে না পারি? তাহলে আমার পরিবার কী খাবে?

এই ভয় আমাকে সব সময় তাড়া করে।

আমার কোনো সঞ্চয় নেই। কারণ যা আয় করি, তাই খরচ হয়ে যায়। কোনো জরুরি খরচ হলে আমি ধার করি।

এই ধার শোধ করতে আরো কাজ করতে হয়। আরো চাপ নিতে হয়।

আমি মাঝে মাঝে ভাবি, আমি কি একটা চক্রে পড়ে গেছি? যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই?

আরাশ যখন বলে, “বাবা, আমি বড় হয়ে অনেক টাকা রোজগার করব। তোমাকে আর কাজ করতে হবে না।”

আমার চোখে পানি আসে। আরাশ বুঝে গেছে যে আমি কষ্ট করি।

আমি আরাশকে বলি, “তুমি পড়াশোনা করো। টাকার চিন্তা করো না।”

কিন্তু আমি জানি, আরাশ বুঝে যাচ্ছে। ও দেখছে আমার চাপ।

আমি চাই না আরাশ আর্থিক চাপ বুঝুক। আমি চাই ও নিশ্চিন্তে বড় হোক।

কিন্তু আমার চাপ লুকানো যাচ্ছে না।

হ্যাপি আমার কষ্ট বোঝে। কিন্তু কিছু বলে না। কারণ ও জানে আমি চাই না ও কাজ করুক।

আমি ভাবি, আমার এই অহংকার কি ঠিক? পরিবারের সবার খোরাকির দায়িত্ব কি শুধু আমার?

কিন্তু আমাদের সমাজে এটাই নিয়ম। পুরুষ উপার্জন করবে। নারী ঘর সামলাবে।

এই নিয়ম আমাকে পিষে দিচ্ছে।

আমি চাই আমার চাপ কমুক। কিন্তু কীভাবে? আয় বাড়িয়ে? নাকি খরচ কমিয়ে?

আয় বাড়ানো আমার হাতে নেই। বাজারে কাজ কম। প্রতিযোগিতা বেশি।

খরচ কমানো মানে পরিবারের মান কমানো।

আমি আটকে গেছি।

কিন্তু আমি হাল ছাড়তে পারি না। কারণ আমার পরিবার আমার ওপর নির্ভরশীল।

এই নির্ভরশীলতা আমার গর্ব। এবং আমার বোঝা।

আমি একা কাঁধে পুরো আকাশ বয়ে নিয়ে চলেছি। কখনো কখনো মনে হয় ভেঙে পড়ব।

কিন্তু তবুও চলি। কারণ আমার থামলে আমার পরিবার থেমে যাবে।

আর সেটা আমি হতে দিতে পারি না।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *