আজ বিকেলে আরাশকে দেখলাম একটা পুরনো ক্যাসেট প্লেয়ার নিয়ে বসে আছে। আমাদের পাড়ার জং ধরা দোকানে পেয়েছে। সে সেই প্লেয়ারে আমার বাবার পুরনো গজল শুনছে। ক্যাসেটের মধ্যে যে টুকরো টুকরো আওয়াজ, সেই scratchy sound – সেটা শুনতে শুনতে তার চোখে এক অদ্ভুত মুগ্ধতা।
“তুই তো স্পটিফাই-এ হাজার গান পাস। এই ভাঙা আওয়াজ কেন শুনছিস?”
“বাবা, এই আওয়াজে একটা আত্মা আছে। স্পটিফাই-এ সব perfect, কিন্তু soul নেই।”
আমার ভিতরে একটা অ্যাপ buffer করতে লাগল যার নাম “Time Paradox ভার্সন জেনারেশন গ্যাপ”।
এই ছেলেটা জন্মেছে ডিজিটাল যুগে। তবুও analog জিনিসের জন্য এই টান কেন?
অফিসে আমার এক তরুণ সহকর্মীকে দেখি সে একটা film camera কিনেছে। “ডিজিটাল ক্যামেরায় কী সমস্যা?”
“স্যার, ডিজিটালে আমি হাজার ছবি তুলি। কিন্তু ফিল্মে যখন ২৪টা শট থাকে, তখন প্রতিটা শট ভেবেচিন্তে তুলতে হয়। সেই ছবিগুলো আলাদা মানে রাখে।”
“কিন্তু তুমি তো কখনো ফিল্ম ক্যামেরা দেখোওনি।”
“না। কিন্তু ইউটিউবে দেখে দেখে শিখেছি। আর মনে হয় আমার জিনের মধ্যে এই আগ্রহ ছিল।”
রাতে হ্যাপির সাথে কথা বলছিলাম। “তোর মনে হয় না আজকালকার বাচ্চারা একটু অদ্ভুত? ওদের কাছে সব আধুনিক জিনিস আছে, তবুও পুরনো জিনিসের পেছনে ছুটছে।”
“হায়দার, আরাশ কি তোকে বলেছে সে কেন সেই ক্যাসেট প্লেয়ার কিনেছে?”
“বলেছে। আত্মা আছে নাকি।”
“তাহলে?”
“কিন্তু সে তো কখনো ক্যাসেট প্লেয়ারের যুগ দেখেইনি। তার নস্টালজিয়া কীসের?”
হ্যাপি মৃদু হেসে বলল, “হায়দার, নস্টালজিয়া মানে শুধু নিজের অতীত না। কখনো কখনো সেই অতীত যা আমাদের থাকা উচিত ছিল।”
আমি বুঝলাম না। পরদিন আরাশকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুই এই analog জিনিসগুলোর জন্য নস্টালজিক কেন? তুই তো সেই সময় ছিলিই না।”
আরাশ তার ক্যাসেট প্লেয়ার দেখিয়ে বলল, “বাবা, আমি জানি সেই সময় ছিলাম না। কিন্তু মনে হয় আমি কিছু মিস করেছি।”
“কী মিস করেছিস?”
“ধৈর্য। এই প্লেয়ারে গান শুনতে হলে ক্যাসেট ঢুকিয়ে রিওয়াইন্ড করতে হয়। পছন্দের গান আসার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু সেই অপেক্ষাতেই একটা মজা আছে।”
“আর স্পটিফাই-এ?”
“স্পটিফাই-এ আমি যে গান চাই সেটা instant পেয়ে যাই। কিন্তু সেই গানের জন্য আর আগ্রহ থাকে না।”
আমার ভিতরের অ্যাপ crashed হয়ে নতুন একটা install হলো। নাম “প্রজন্মগত প্রজ্ঞা ভার্সন অপ্রত্যাশিত”।
নামাজ পড়ে ভাবছিলাম। আল্লাহর ইবাদতেও তো একই ব্যাপার। আগে মানুষ হাতে কুরআন নিয়ে ধীরে ধীরে পড়ত। এখন অ্যাপে তাৎক্ষণিক পেয়ে যাই। কিন্তু সেই ধীরগতির মধ্যে যে মনোযোগ ছিল, সেটা হারিয়ে যায়।
পরদিন রহিম চাচার কাছে গেলাম আরাশকে নিয়ে। চাচা আরাশের ক্যাসেট প্লেয়ার দেখে খুশি হলেন।
“বাহ্! এই জিনিস এখনো পাওয়া যায়?”
“চাচা,” আরাশ বলল, “আপনি এইসব জিনিস মিস করেন?”
“করি বাবা। কিন্তু তুই যে এগুলো পছন্দ করিস, সেটা আরও ভালো লাগে।”
“কেন?”
“কারণ তুই বুঝেছিস যে কিছু জিনিস slow হলেই ভালো হয়। সব কিছু fast লাগে না।”
আরাশ বলল, “চাচা, আমার বন্ধুরা বলে আমি weird। কিন্তু আমার মনে হয় আমি সঠিক।”
চাচা হেসে বলললেন, “বাবা, প্রতিটা প্রজন্ম কিছু জিনিস হারায়, কিছু জিনিস পায়। তোদের প্রজন্মের সুবিধা হলো তোরা choose করতে পারো কী নিবে, কী ছাড়বে।”
ফেরার পথে আরাশ বলল, “বাবা, আমি কি সত্যিই digital native?”
“কেন?”
“কারণ আমার মনে হয় আমার ভিতরে একটা analog heart আছে।”
আমি বুঝলাম। digital native প্রজন্মের analog nostalgia আসলে একটা প্রতিক্রিয়া। too much perfection এর বিরুদ্ধে। too much speed এর বিরুদ্ধে। too much convenience এর বিরুদ্ধে।
ওরা খুঁজছে সেই মানবিক অভিজ্ঞতা যেটা technology এর আগে ছিল। imperfection এর সৌন্দর্য। waiting এর আনন্দ। struggle এর মূল্য।
এটা নস্টালজিয়া নয়। এটা balance খোঁজা।
আরাশ digital world এ জন্মেছে, কিন্তু তার soul analog experiences চায়। সে চায় touch করতে, feel করতে, wait করতে।
হয়তো এটাই মানুষের চিরন্তন প্রকৃতি। আমরা যতই এগিয়ে যাই, আমাদের roots এর দিকে ফিরে তাকাতে হয়।
digital native হয়েও analog heart রাখা সম্ভব। এটা contradiction নয়, এটা completeness।
একটু ভাবনা রেখে যান