ব্লগ

“আমার সময়ে” র পুরনো কাহিনী

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আরাশ বলল, “স্কুলের ক্যান্টিনে খাবার খুব দামী।” আর সেই মুহূর্তেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “আমার সময়ে পাঁচ টাকায় পেট ভরে খাওয়া যেত।” কথাটা বলার সাথে সাথেই মনে হল, আমি আমার বাবার মতো হয়ে গেছি। সেই একই বাক্য, সেই একই স্বর।

মনে পড়ে গেল বাবার কথাগুলো। আমি যখন কোনো কিছু চাইতাম, তিনি বলতেন, “আমার সময়ে এত কিছু ছিল না।” যখন লেখাপড়া নিয়ে অভিযোগ করতাম, বলতেন, “আমার সময়ে হারিকেনের আলোয় পড়তে হত।”

আজ আমিও সেই একই পথে হাঁটছি। আরাশের প্রতিটি দাবি, প্রতিটি অভিযোগের উত্তরে আমার মুখে চলে আসে “আমার সময়ে”। যেন এই বাক্যটাই সব সমস্যার সমাধান।

আরাশ যখন বলে, “বন্ধুদের অনেকের স্মার্টফোন আছে,” আমি বলি, “আমার সময়ে মোবাইল ফোনই ছিল না।” আরাশ যখন বলে, “ইন্টারনেট স্লো,” আমি বলি, “আমার সময়ে ইন্টারনেট বলে কিছু ছিল না।”

কিন্তু এই “আমার সময়ে” র গল্পগুলো কি সত্যিই কার্যকর? আরাশ কি সত্যিই এসব শুনে কিছু শেখে? নাকি সে শুধু বিরক্ত হয়?

একদিন আরাশ বলল, “আব্বু, আপনার সময়ের গল্প তো অনেক শুনলাম। কিন্তু এখন তো আর সেই সময় নেই।” তার এই কথায় আমি থতমত খেয়ে গেলাম। সত্যিই তো, আমি যেই যুগের কথা বলি, সেই যুগ আর নেই।

কিন্তু তবুও মুখে এই কথাগুলো চলে আসে। হয়তো এটা একটা প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া। যখন মনে হয় আরাশের চাহিদা অন্যায়, তখন আমার শৈশবের কষ্টের কথা বলে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি।

আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “আমি কি ভুল পথে যাচ্ছি? আমার শৈশবের কষ্টের কথা দিয়ে আরাশকে কি সত্যিই সঠিক শিক্ষা দিচ্ছি?”

মনে পড়ে বাবা বলতেন, “আমার সময়ে বই ছিল দুর্লভ। একটা বই পাঁচজন মিলে পড়তাম।” আজ আরাশের রুমে শত শত বই। সে চাইলেই যেকোনো বই পড়তে পারে। কিন্তু পড়ে না।

“আমার সময়ে টিভি ছিল একটা। পুরো পরিবার একসাথে বসে দেখতাম।” আজ আমাদের বাড়িতে তিনটা টিভি। কিন্তু সবাই আলাদা আলাদা প্রোগ্রাম দেখে।

এই “আমার সময়ে” র গল্পগুলো কি আসলেই সেই সময়ের সঠিক চিত্র? নাকি আমরা অতীতকে একটু বেশি রোমান্টিক করে দেখি?

সত্যি কথা বলতে, আমার শৈশব এত মধুর ছিল না যত আমি আরাশকে বলি। অনেক কষ্ট ছিল, অনেক অভাব ছিল। কিন্তু সেই কষ্টগুলোও এখন ভালো স্মৃতি মনে হয়।

কখনো কখনো মনে হয় আমি আরাশের সাথে একটা প্রতিযোগিতা করছি। কার শৈশব বেশি কষ্টের ছিল। কিন্তু এই প্রতিযোগিতার কোনো মানে হয় না।

হ্যাপি বলে, “তুমি আরাশকে তোমার সময়ের গল্প বলে কি বোঝাতে চাও?” আমি ভেবে পাই না। হয়তো বোঝাতে চাই যে সে যতটা কষ্ট মনে করে, আসলে তার জীবন অনেক সুন্দর।

আরাশ যখন বলে, “পড়াশোনার চাপ খুব বেশি,” আমি বলি, “আমার সময়ে অত সুবিধা ছিল না।” কিন্তু এই তুলনা কি ঠিক? প্রতিটি যুগের নিজস্ব চ্যালেঞ্জ আছে।

একদিন আরাশ বলল, “আব্বু, আপনার সময় ছিল অন্যরকম। এখনকার সময় অন্যরকম। আপনি কি আমাকে আপনার সময়ের মতো বড় হতে বলছেন?”

তার এই প্রশ্নে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। সত্যিই তো, আমি কি চাই আরাশ আমার মতো কষ্ট করুক? নাকি চাই সে আরো ভালো জীবন পাক?

এখন বুঝি যে “আমার সময়ে” বলে শুরু হওয়া গল্পগুলো আসলে একটা দূরত্ব তৈরি করে। আরাশ মনে করে আমি তার বর্তমান সমস্যাগুলো বুঝি না।

চেষ্টা করি কম বলতে “আমার সময়ে”। বরং আরাশের সময়ের কথা শোনার চেষ্টা করি। তার চ্যালেঞ্জগুলো বোঝার চেষ্টা করি।

কিন্তু মাঝে মাঝে মুখ ফস্কে বেরিয়ে যায় সেই পুরনো কথা। “আমার সময়ে…” এবং তখনই আরাশের মুখে একটা বিরক্তির ছাপ দেখি।

হয়তো এটাই প্রজন্মের ব্যবধান। প্রতিটি প্রজন্ম মনে করে তাদের সময়টাই ছিল সবচেয়ে কঠিন, সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। আর এই মানসিকতা দিয়েই তারা পরের প্রজন্মের সাথে কথা বলে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

জীবন

সংখ্যা

ডিসেম্বর ২০২৫ · 7 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *