ব্লগ

পনেরো বছরের খতিয়ান

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ আমাদের বিয়ের পনেরো বছর। হ্যাপি সকাল থেকে ব্যস্ত। বিশেষ খাবার তৈরি করছে। আমি বসে আছি হিসাব কষতে।

পনেরো বছরে আমি হ্যাপিকে কী দিয়েছি? হ্যাপি আমাকে কী দিয়েছে? হিসাবটা মিলছে কি?


বিয়ের প্রথম বছরে আমি হ্যাপিকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, “তোমাকে খুশি রাখব।” কিন্তু খুশি তো চোখে দেখা যায় না। মাপা যায় না।

হ্যাপি কি খুশি? আমি জানি না।

আমি হ্যাপিকে দিয়েছি একটা ঘর। ভাড়ার ঘর। নিজের নয়। সেই ঘরে আমরা স্বপ্ন দেখেছি একদিন নিজের বাড়ি হবে। পনেরো বছর পর সেই স্বপ্ন এখনও স্বপ্নই।

হ্যাপি আমাকে দিয়েছে একটা ঘর যা তার ভালোবাসায় পূর্ণ। সেই ঘরে আমি নিরাপদ বোধ করি।

হিসাবে হ্যাপি এগিয়ে।

আমি হ্যাপিকে দিয়েছি আরাশ। একটা সন্তান। যে আমাদের জীবনে অর্থ এনে দিয়েছে।

হ্যাপি আমাকে দিয়েছে পিতৃত্ব। এমন একটা অনুভূতি যা আমাকে পূর্ণতা দিয়েছে।

এই হিসাবে আমরা সমান।

আমি হ্যাপিকে দিয়েছি অনিশ্চয়তা। কখন চাকরি থাকবে, কখন যাবে। কখন টাকা আসবে, কখন ফুরিয়ে যাবে।

হ্যাপি আমাকে দিয়েছে স্থিরতা। আমার জীবনে যতই অস্থিরতা থাকুক, ও আমার জন্য একটা ভিত্তি।

হিসাবে আবার হ্যাপি এগিয়ে।

আমি হ্যাপিকে দিয়েছি স্বাধীনতা। ও যা চায়, তা করতে পারে। ও যেভাবে সংসার চালাতে চায়, সেভাবে চালায়।

হ্যাপি আমাকে দিয়েছে বাঁধন। এমন একটা বাঁধন যা আমাকে দায়িত্বশীল করেছে। পথ দেখিয়েছে।

এটা কার পক্ষে? বুঝতে পারছি না।

আমি হ্যাপিকে দিয়েছি আমার সময়। অনেকটা নয়, কিন্তু যতটুকু পারি।

হ্যাপি আমাকে দিয়েছে ওর সম্পূর্ণ জীবন। ওর কৈশোরের শেষ দিনগুলো, ওর যৌবনের সমস্ত বছর।

হিসাবে হ্যাপি অনেক এগিয়ে।

আমি হ্যাপিকে দিয়েছি আমার পরিবার। আমার মা, যিনি হ্যাপিকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবেসেছিলেন।

হ্যাপি আমাকে দিয়েছি ওর পরিবার। যারা আমাকে আপন করে নিয়েছে।

এই হিসাবে আমরা সমান।

আমি হ্যাপিকে দিয়েছি আমার দুর্বলতা। আমার অক্ষমতা। আমার সীমাবদ্ধতা।

হ্যাপি আমাকে দিয়েছে ওর শক্তি। আমার দুর্বলতার সময় ও শক্তিশালী থেকেছে।

হিসাবে হ্যাপি এগিয়ে।

আমি হ্যাপিকে দিয়েছি আমার স্বপ্ন। লেখালেখির স্বপ্ন। যা এখনও অধরা।

হ্যাপি আমাকে দিয়েছে ওর স্বপ্নের আত্মত্যাগ। ও ডাক্তার হতে চেয়েছিল। কিন্তু আমার জন্য সেই স্বপ্ন ছেড়ে দিয়েছে।

হিসাবে আমি অনেক পিছিয়ে।

আমি হ্যাপিকে দিয়েছি কষ্ট। আর্থিক কষ্ট। মানসিক কষ্ট। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কষ্ট।

হ্যাপি আমাকে দিয়েছে সান্ত্বনা। প্রতিটি কষ্টে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে।

হিসাবে আমি অনেক অনেক পিছিয়ে।

আমি হ্যাপিকে দিয়েছি ভালোবাসা। কিন্তু সেই ভালোবাসা কতটুকু? কতটা গভীর?

হ্যাপি আমাকে দিয়েছে নিঃশর্ত ভালোবাসা। আমার সব দোষ, সব ত্রুটি নিয়েও ও আমাকে ভালোবাসে।

হিসাবে আমি পরাজিত।

পনেরো বছরের হিসাব কষে দেখলাম, আমি হ্যাপির কাছে ঋণী। অনেক বেশি ঋণী।

হ্যাপি আমাকে যা দিয়েছে, আমি তার একটা ছোট অংশও ফেরত দিতে পারিনি।

কিন্তু হ্যাপি কখনো হিসাব করে না। ও কখনো বলে না, “আমি তোমাকে এত দিয়েছি, তুমি আমাকে কী দিয়েছ?”

হয়তো ভালোবাসার কোনো হিসাব হয় না। হয়তো ভালোবাসা দেওয়া-নেওয়ার বিষয় নয়।

কিন্তু আমি জানি, আমার আরো দেওয়ার আছে। আমাকে হ্যাপির জন্য আরো কিছু করতে হবে।

আজ বার্ষিকীর দিনে আমি নতুন প্রতিশ্রুতি করি। পরের পনেরো বছরে আমি হিসাবটা সমান করার চেষ্টা করব।

হ্যাপি রান্নাঘর থেকে ডাকল, “খেতে এসো।”

আমি গেলাম। আমার মুখে হাসি। কিন্তু মনে একটা দায়বদ্ধতা। হ্যাপির কাছে আমার অনেক ঋণ।

সেই ঋণ শোধ করতে বাকি জীবনটা লেগে যাবে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *