আজ সকালে হ্যাপি পোলাও রান্না করছে। হলুদ রং করা চাল, মশলার ঝাঁঝ, আর সেই পরিচিত গন্ধ। হঠাৎ আমার নাকে এলো সেই আশ্চর্য ঘ্রাণ। আর সাথে সাথে সময় পিছিয়ে গেল বিশ বছর।
আমি রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে রইলাম। এই গন্ধ—এটা শুধু পোলাওর গন্ধ নয়। এটা মায়ের হাতের গন্ধ। সেই হাত যা আমাকে বানিয়েছে।
মা মারা গেছেন পাঁচ বছর হলো। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে—তিনি এখানেই আছেন। রান্নাঘরে। হ্যাপির পাশে দাঁড়িয়ে।
আমি চোখ বন্ধ করলাম। গন্ধটা আরো গভীরে নিলাম। আর দেখলাম—আমি আবার সেই ছোট্ট ছেলে। যে মায়ের রান্নার অপেক্ষায় রান্নাঘরের মেঝেতে বসে থাকে।
“মা, কী রান্না করছো?” আমি জিজ্ঞেস করতাম। “পোলাও,” মা বলতেন মৃদু হেসে। “তোর প্রিয়।” “কখন হবে?” “ধৈর্য ধর। ভালো জিনিসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।”
আজ বুঝি মায়ের সেই কথার মানে। ভালো জিনিসের জন্য সত্যিই অপেক্ষা করতে হয়। আর মায়ের রান্না ছিল জীবনের সবচেয়ে ভালো জিনিস।
কিন্তু এই “ভালো” মানে কী? স্বাদ? নাকি ভালোবাসা? আমার মনে হয়—মায়ের রান্নায় তার আত্মা মেশানো থাকত। প্রতিটি চালের দানায়, প্রতিটি মশলায়।
হ্যাপি বলল, “কী দেখছো?” আমি বললাম, “অতীত।” “কেমন অতীত?” “যেখানে মা আছেন।”
আমি রান্নাঘরে ঢুকলাম। হ্যাপির পাশে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম। তার হাতের নড়াচড়া আলাদা। মা অন্যভাবে নাড়তেন। আরো যত্নে। যেন চাল নয়—ভালোবাসা নাড়ছেন।
মা যেভাবে রান্না করতেন, সেটা ছিল একটা আচার। একটা পূজা। তিনি প্রতিটি উপাদান যোগ করতেন প্রার্থনার মতো করে। যেন বলছেন—এই খাবার আমার সন্তানের শরীর হয়ে যাবে।
আরাশ এসে বলল, “কী হচ্ছে?” আমি বললাম, “দাদির কথা মনে পড়েছে।” “দাদি কেমন ছিলেন?” “তোমার মায়ের মতো। শুধু আরো নীরব।”
আরাশের চোখে কৌতূহল। সে দাদিকে খুব ছোটবেলায় হারিয়েছে। কিন্তু আজ এই গন্ধে হয়তো সে-ও অনুভব করছে কিছু।
মায়ের ভালোবাসা ছিল নীরব। তিনি কম কথা বলতেন, কিন্তু বেশি করতেন। প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় উঠে রান্নাঘরে। আমাদের জন্য খাবার তৈরি। কোনো অভিযোগ নেই। কোনো ক্লান্তি নেই।
পোলাওর ভাপ উঠছে। সেই গন্ধ আরো তীব্র হয়েছে। আমার মনে পড়ল—মা যখন অসুস্থ ছিলেন, তখনও রান্না করতেন। হাত কাঁপত, কিন্তু থামতেন না।
“মা,” আমি বলেছিলাম, “তুমি বিশ্রাম নাও।” মা বলেছিলেন, “আমার হাতের রান্না না খেলে তোদের পেট ভরে না।”
আজ সেই কথার মানে বুঝি। মায়ের হাতের রান্না শুধু পেট ভরাত না—হৃদয় ভরাত। একটা নিরাপত্তা দিত। একটা পরিচয় দিত।
হ্যাপি বলল, “পোলাও তৈরি।” আমি এক চামচ মুখে দিলাম। চোখ বুজে এলো। এই স্বাদে মায়ের হাতের ছোঁয়া।
“বাবা,” আরাশ বলল, “এটা দাদির মতো লাগছে।” আমি অবাক হয়ে তাকালাম। “তুমি কীভাবে জানো?” “জানি না। কিন্তু মনে হয় দাদি এখানে আছেন।”
আরাশ ঠিক বলেছে। দাদি আছেন। এই গন্ধে। এই স্বাদে। এই ভালোবাসায়। আর এইভাবেই হয়তো মানুষ অমর হয়।
হ্যাপি হেসে বলল, “তুমি আমার রান্নার প্রশংসা করতে গিয়ে মায়ের কথা বলো।” আমি বললাম, “এটাই সবচেয়ে বড় প্রশংসা। কারণ মায়ের রান্নাই ছিল আমার জীবনের স্বর্ণমান।”
খাওয়া শেষে আমি রান্নাঘরে দাঁড়ালাম। সেই গন্ধ এখনো আছে। কিন্তু ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। মায়ের উপস্থিতিও।
কিন্তু চলে যাওয়ার আগে মা যেন আমাকে বুঝিয়ে দিলেন—তিনি আসলে কোথাও যাননি। তিনি আছেন হ্যাপির প্রতিটি যত্নে। আছেন আরাশের হাসিতে। আছেন আমার স্মৃতির প্রতিটি কোণে।
আমি বুঝলাম—মায়েরা মরেন না। তারা রূপ বদলায়। আজ হ্যাপির হাতে মায়ের ভালোবাসা। কাল আরাশের হাতে যাবে। এইভাবে চলে ভালোবাসার অনন্ত যাত্রা।
আর এই রান্নার গন্ধ সেই যাত্রার একটা সাক্ষী।
একটু ভাবনা রেখে যান