ব্লগ

রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রশ্ন

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

হ্যাপি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা পেঁয়াজ। চোখে এক ধরনের অসহায়ত্ব। আমি দেখছি তার পিঠ। কাঁধ দুটো কেমন যেন ঝুলে আছে।

“কী রান্না করব?”

সে নিজের সাথে কথা বলছে। কিন্তু আমিও শুনতে পাচ্ছি।

আমি রান্নাঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ভাবি – এই একটা প্রশ্ন কীভাবে একজন মানুষকে এতটা কাবু করে ফেলতে পারে?

“কী রান্না করব?”

আমার মা-ও এই প্রশ্ন করতেন। আমার দাদি-ও করতেন। আর এখন হ্যাপিও করে। যেন এই প্রশ্নটা একটা অভিশাপ – এক মায়ের কাছ থেকে আরেক মায়ের কাছে চলে যায়।

“হ্যাপি, কী ভাবছ?”

সে ঘুরে তাকাল। তার চোখে একটা ক্লান্তি। “জানি না। মাথায় কিছুই আসছে না। গতকাল ডাল, পরশুদিন মাছ। আজ কী করব?”

আমি তার কাছে গেলাম। “এতো চিন্তা কেন?”

“চিন্তা না করে উপায় কী? তোমরা তো খেতে চাও। আরাশের স্কুল আছে। তোমার অফিস আছে। আমাকেই ভাবতে হয় কী রান্না করব।”

আমার বুকটা কেঁপে উঠল। এই “আমাকেই ভাবতে হয়” কথাটার মধ্যে কী যন্ত্রণা আছে! একা। একদম একা। একটা মানুষ প্রতিদিন সকালে উঠে ভাবে – আজ পরিবারের জন্য কী রান্না করব।

“কেন শুধু তোমাকেই ভাবতে হবে?”

হ্যাপি আমার দিকে তাকাল। “তুমি ভাবতে পারো?”

আমি থমকে গেলাম। পারি? সত্যি পারি?

“আমি… আমি পারি।” আমি বললাম।

“তাহলে বল, আজ কী রান্না করব?”

আমার মুখে কোনো কথা এল না। মাথায় শূন্যতা। কিছুই মনে আসছে না।

হ্যাপি হাসল। “দেখেছ?”

আমি বুঝলাম। এটা শুধু রান্নার প্রশ্ন নয়। এটা দায়িত্বের প্রশ্ন। এটা সিদ্ধান্তের প্রশ্ন। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে, একজন মানুষ অন্যের জন্য চিন্তা করে।

“হ্যাপি, তুমি কি কখনো ভেবেছ – এই প্রশ্নটা তোমার কাছে কেন এসেছে?”

“মানে?”

“মানে, কেন তোমাকেই ভাবতে হয় কী রান্না করব? আমি কেন ভাবি না? আরাশ কেন ভাবে না?”

হ্যাপি পেঁয়াজটা রেখে দিল। “আমি জানি না। হয়তো এটাই নিয়ম। মেয়েরাই রান্নার কথা ভাবে।”

“কিন্তু এই নিয়মটা কে বানিয়েছে?”

আমার প্রশ্নে হ্যাপি নিরব হয়ে গেল।

আমি ভাবি – আমার মা সারাজীবন এই প্রশ্নের সাথে লড়েছেন। কী রান্না করব? কী রান্না করব? প্রতিদিন সকালে উঠে এই যুদ্ধ। কী খাওয়াব পরিবারকে? কীভাবে সবার পছন্দের কথা মাথায় রেখে রান্না করব?

“হ্যাপি, তুমি জান, আমার বাবা কী বলতেন?”

“কী?”

“উনি বলতেন, ‘খাবার শুধু খাবার না। খাবার হলো ভালোবাসা।’ তুমি যখন কী রান্না করব ভেবে কষ্ট পাও, আসলে তুমি ভাবছ – কীভাবে আমাদের ভালোবাসব।”

হ্যাপির চোখে পানি এসে গেল।

“কিন্তু হায়দার, এটা কি ঠিক? আমি কেন একাই ভাবব? তোমাদের কোনো দায়িত্ব নেই?”

আমি লজ্জা পেলাম। সত্যিই তো। আমি কখনো ভাবি না। অফিস থেকে ফিরে এসে দেখি খাবার তৈরি। খেয়ে নিই। ধন্যবাদও দিই না।

“ঠিক না,” আমি বললাম। “আমারও দায়িত্ব আছে। আরাশেরও আছে।”

আরাশ স্কুল থেকে ফিরে এসেছে। “কী হয়েছে? মা কাঁদছেন কেন?”

“কাঁদছি না,” হ্যাপি মুখ মুছল। “জিজ্ঞেস করছিলাম আজ কী রান্না করব।”

“আমি বলি,” আরাশ বলল। “চলেন আমরা তিনজন মিলে ভাবি।”

আমি অবাক হলাম। এগারো বছরের একটা ছেলে কী সহজভাবে সমাধান দিল!

“ঠিক আছে,” আমি বললাম। “আজ থেকে আমরা তিনজনই ভাবব কী রান্না করব।”

কিন্তু সত্যি কথা হলো, পরদিন সকালে উঠে হ্যাপি আবার একাই দাঁড়িয়ে থাকবে রান্নাঘরে। আবার ভাববে – কী রান্না করব? কারণ অভ্যাস এতো সহজে পালটায় না।

সমাজ এতো সহজে পালটায় না।

কিন্তু চেষ্টা করা যায়। একটু একটু করে।

আমি হ্যাপির হাত ধরলাম। “জানো, আমার মনে হয় ‘কী রান্না করব’ এই প্রশ্নটা ভুল।”

“তাহলে সঠিক প্রশ্নটা কী?”

“সঠিক প্রশ্ন হলো – ‘আমরা কী খেতে চাই?’ তুমি একা ভাবছ বলেই কষ্ট পাচ্ছ। আমরা সবাই মিলে ভাবলে, উত্তর সহজ হয়ে যাবে।”

সন্ধ্যায় আমরা তিনজন মিলে বসলাম। একটা কাগজে লিখলাম – আগামী সাতদিনের মেনু। সবার পছন্দ, সবার চাহিদা মিলিয়ে।

হ্যাপির মুখে একটা হাসি ফিরে এল।

কিন্তু রাতে শুয়ে আমি ভাবলাম – কত মা, কত স্ত্রী এখনো একা দাঁড়িয়ে আছেন রান্নাঘরে। কত মানুষ প্রতিদিন সকালে উঠে ভাবেন – কী রান্না করব?

এই প্রশ্নের মধ্যে কত একাকীত্ব! কত দায়িত্বের বোঝা!

আর আমরা, যারা খাই, আমরা কি কখনো ভাবি – কী রান্না করব?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *