রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছি। সামনে সব উপকরণ সাজানো। আজ কী রান্না করব – এই প্রশ্নের উত্তর জানি। হ্যাপি আজ সকালেই বলে গেছে কী করতে হবে। আরাশের পছন্দের তরকারি। কিন্তু আমার শরীরটা যেন পাথর হয়ে আছে।
কী এমন ক্লান্তি যে একটা আলু কাটতেও ইচ্ছা করছে না। অফিস থেকে ফিরে এসেই এই অবস্থা। মাথায় একটা অদ্ভুত চাপ। যেন কেউ মাথার উপর একটা ভারী কিছু রেখে দিয়েছে।
এই ক্লান্তিটা শারীরিক নাকি মানসিক, সেটাও বুঝতে পারি না। শরীর বলছে বিশ্রাম নাও, মন বলছে পরিবারের দায়িত্ব পালন কর। এই দুইয়ের মাঝে আমি আটকে গেছি।
হ্যাপি অফিসে। আরাশ স্কুল থেকে ফিরে ক্ষুধার্ত। সে জিজ্ঞেস করেছে, “আব্বু, খাবার কখন হবে?” আমি বলেছি, “একটু পরেই।” কিন্তু সেই একটু পরের মধ্যে যেন অনন্তকাল লুকিয়ে আছে।
বাবার কথা মনে পড়ে। তিনি কখনো এমন বলতেন না যে রান্না করতে ইচ্ছা করছে না। তার যুগে পুরুষরা রান্না করত না। কিন্তু এখন তো অন্য যুগ। এখন তো আমাকেও রান্না করতে হয়। কিন্তু কেন এত কষ্ট লাগে?
গ্যাসের চুলা জ্বালাতে পারছি না। মনে হচ্ছে এই সামান্য কাজটাও একটা পর্বত সমান। কেন এমন হয়? আমি কি অসুস্থ? নাকি শুধু খুব বেশি চিন্তা করি বলে?
মোবাইলে অর্ডার দেওয়ার কথা মাথায় আসে। কিন্তু সেই টাকা কোথায়? এই মাসে বেতন এমনিতেই কম। বাইরের খাবারের টাকা কোথা থেকে আনব?
আল্লাহর কাছে মনে মনে বলি, “আমার এই অবস্থা কেন? কেন আমি এমন সাধারণ একটা কাজও করতে পারছি না?” কিন্তু উত্তর আসে না। বরং মনে হয় যেন আমার দুর্বলতাগুলো আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
অবশেষে নিজেকে জোর করে এক কাপ চা বানাই। চা খেতে খেতে একটু ভালো লাগে। তারপর ধীরে ধীরে একটা আলু কাটি। তারপর আরেকটা। এভাবে একটু একটু করে কাজটা এগিয়ে নিয়ে যাই।
আরাশ এসে দেখে আমি রান্না করছি। বলে, “আব্বু, আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে আপনি যুদ্ধ করছেন।” সত্যিই তো, আমি যুদ্ধ করছি। নিজের সাথেই যুদ্ধ।
রান্না শেষ হতে হতে রাত হয়ে যায়। খেতে বসে আরাশ বলে, “খুব ভালো হয়েছে।” তার এই কথায় মনে হয় যেন সব পরিশ্রম সার্থক হয়ে গেল।
কিন্তু রাতে শুয়ে মনে হয় এই সংগ্রাম তো প্রতিদিন। প্রতিদিন এই একই অনিচ্ছা, একই ক্লান্তি। কবে পর্যন্ত এভাবে নিজের সাথে যুদ্ধ করব?
হয়তো এটাই জীবন। প্রতিদিন নিজেকে জোর করা। নিজের অনিচ্ছার বিরুদ্ধে লড়াই করা। এটা কোনো ব্যতিক্রম নয়, এটাই স্বাভাবিক।
আগামীকাল আবার একই অবস্থা হবে। আবার সেই একই সংগ্রাম। কিন্তু আজ যেমন শেষ পর্যন্ত পেরেছি, আগামীকালও পারব। এই বিশ্বাসটুকুই যথেষ্ট।
একটু ভাবনা রেখে যান