রাত ২:৩০। আমি এখনো জেগে আছি, ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। একটা ইউটিউব ভিডিও থেকে আরেকটা ভিডিও। একটা ফেসবুক পোস্ট থেকে আরেকটা পোস্ট। সময়ের হিসেব নেই।
মাথার একটা অংশ বলছে, “ঘুমিয়ে পড়। কাল সকালে উঠতে হবে।” কিন্তু আরেকটা অংশ বলছে, “আরেকটু। শুধু আরেকটু।” এই দুই শক্তির মাঝে আমি আটকা পড়ে আছি।
কাল অফিসে গিয়ে সারাদিন ঝিমিয়ে থাকব। বসের কাছে বকা খাব। কাজে ভুল করব। সবার সামনে লজ্জিত হব। এসব জানি, কিন্তু তবুও ঘুমাতে পারছি না।
হ্যাপি ও আরাশ দুজনেই ঘুমিয়ে পড়েছে। পুরো বাড়ি নিরব। শুধু আমি একা জেগে আছি, রাতের এই নিরবতায়। এই একাকীত্বে একটা অদ্ভুত আনন্দ আছে, কিন্তু সেই সাথে আছে একটা গভীর অপরাধবোধও।
রাত ৩টায় যখন ফোন রেখে চোখ বন্ধ করি, তখন মনে হয় “কাল সত্যিই কষ্ট হবে।” কিন্তু এই চিন্তাও আমাকে আরো জাগিয়ে রাখে। ঘুমের চেয়ে চিন্তা বেশি শক্তিশালী।
সকাল ৬টায় অ্যালার্মের শব্দ। চোখ খুলতে পারছি না। মাথা ভারী, মুখ শুকনো। মনে পড়ে রাতের কথা। “আহ, আবার করেছি।” এই অনুশোচনা প্রতিটি সকালে একইরকম।
হ্যাপি বলে, “তুমি আবার রাত জেগেছিলে?” আমি বলি, “একটু কাজ ছিল।” কিন্তু জানি এটা মিথ্যা। কোনো কাজ ছিল না। শুধু ইচ্ছাশক্তির অভাব ছিল।
অফিসে গিয়ে কফি খেতে খেতে ভাবি, “আজ রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাব।” কিন্তু জানি এই প্রতিজ্ঞা আবার ভাঙা হবে। রাতের সেই মধুর স্বাধীনতা আবার আমাকে ডাকবে।
কেন এমন হয় আমার সাথে? কেন আমি জানি যে রাত জাগা ক্ষতিকর, তবুও জেগে থাকি? এটা কি আসক্তি? নাকি পালিয়ে থাকার চেষ্টা?
হয়তো দিনের যে চাপ, যে দায়িত্ব, সেসব থেকে রাতে মুক্তি পাই। রাতে কেউ কিছু চায় না আমার কাছে। কোনো কাজের চাপ নেই। শুধু আমি আর আমার সময়।
কিন্তু এই স্বাধীনতার দাম দিতে হয় পরদিন। ক্লান্ত শরীর, বিক্ষিপ্ত মন, কাজে অমনোযোগিতা। এই দামটা কি সেই স্বাধীনতার চেয়ে বেশি?
আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “কেন আমি নিজের ক্ষতি জেনেও সেই কাজ করি? কেন আমার ইচ্ছাশক্তি এত দুর্বল?” মনে হয় উত্তর পাচ্ছি – “শৃঙ্খলাই মুক্তির পথ।”
দুপুরে খাওয়ার পর যখন চোখ জড়িয়ে আসে, তখন মনে হয় “গতকাল রাতে ঘুমালেই এই অবস্থা হত না।” কিন্তু এই অনুশোচনা শুধু একদিনের জন্য। আগামীকাল আবার ভুলে যাব।
সহকর্মী জামিউর বলে, “তোর চোখ দেখে মনে হচ্ছে সারারাত জেগেছিস।” আমি হাসি দিয়ে এড়িয়ে যাই। কিন্তু ভিতরে লজ্জা লাগে যে আমার দুর্বলতা এত স্পষ্ট।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে ঠিক করি, “আজ রাত ১১টায় ঘুমিয়ে যাব।” কিন্তু জানি এই ঠিক করাটাও একটা নাটক। রাত এলেই আবার সেই একই চক্র।
রাতে আবার ফোন হাতে নিয়ে বসি। “শেষবার দেখছি।” কিন্তু এই শেষবার আর শেষ হয় না। আবার ২টা, ৩টা হয়ে যায়। আবার সকালে অনুশোচনা।
এই চক্র কবে ভাঙবে? কবে আমি রাতকে ভোগ করার বদলে ঘুমের জন্য ব্যবহার করব? কবে সকালে উঠে অনুশোচনার বদলে সতেজতা অনুভব করব?
হয়তো একদিন। হয়তো একদিন বুঝব যে রাতের সেই মিথ্যা স্বাধীনতার চেয়ে সকালের প্রকৃত শক্তি অনেক বেশি মূল্যবান। সেদিন পর্যন্ত এই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।
একটু ভাবনা রেখে যান