রাত একটা। সবাই ঘুমিয়ে। কিন্তু আমার ঘুম নেই। মুখটা শুকিয়ে গেছে। পানি খেতে উঠলাম।
রান্নাঘরে গিয়ে পানি খেলাম। তারপর চোখ পড়ল ফ্রিজে।
ফ্রিজে কী আছে দেখি।
আমি ফ্রিজের দিকে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু হাত বাড়াতে গিয়ে থমকে গেলাম।
আওয়াজ হবে।
ফ্রিজের দরজা খোলার আওয়াজ। সেই ‘ক্লিক’ শব্দ। তারপর ভিতরের আলো জ্বলার শব্দ। কম্প্রেসারের শব্দ।
রাতের নিস্তব্ধতায় এই শব্দ খুব জোরে শোনায়।
হ্যাপি জেগে যাবে। আরাশ জেগে যাবে।
তাহলে জানাজানি হয়ে যাবে যে আমি রাতের বেলা ফ্রিজ খুলেছি।
কেন লজ্জা লাগছে? এটা তো আমার নিজেরই ফ্রিজ। আমি চাইলে যেকোনো সময় খুলতে পারি।
তবুও একটা অপরাধবোধ কাজ করছে।
রাতে ফ্রিজ খোলা মানে – লোভ। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস। গোপনে খাওয়া।
আমি দাঁড়িয়ে আছি ফ্রিজের সামনে। যেন কোনো নিষিদ্ধ কাজ করতে যাচ্ছি।
কী হাস্যকর! আমি যে খাবার নিজেই কিনেছি, সেই খাবার খেতে গিয়ে অপরাধী মনে হচ্ছে।
খুব আস্তে আস্তে হ্যান্ডেল ধরলাম। খুব সাবধানে দরজা খুললাম।
‘ক্লিক!’
শব্দটা যতটা আস্তে করেছি, তার চেয়ে অনেক জোরে শোনাল।
আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। কান পেতে শুনলাম। কেউ জেগেছে নাকি?
না। কোনো আওয়াজ নেই।
ফ্রিজের ভিতরে তাকালাম। কালকের রান্না আছে। কিছু ফল আছে। দুধ আছে।
আমি একটা আপেল নিলাম। দরজা বন্ধ করলাম। আবার সেই ‘ক্লিক’ শব্দ।
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। আপেলটা খেলাম।
কিন্তু উপভোগ করতে পারলাম না। সারাক্ষণ মনে হচ্ছিল – কেউ দেখছে নাকি?
পরদিন সকালে আরাশ বলল, “বাবা, রাতে কি তুমি ফ্রিজ খুলেছিলে?”
আমার হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।
“কেন? তুই শুনেছিস?”
“হ্যাঁ। ‘ক্লিক ক্লিক’ শব্দ হচ্ছিল।”
আমি মিথ্যা বলতে পারতাম। বলতে পারতাম – “না, আমি খুলিনি।” কিন্তু বললাম, “হ্যাঁ, পানি খেতে গিয়ে একটা আপেল নিয়েছিলাম।”
“আমিও অনেক সময় রাতে ফ্রিজ খুলি,” আরাশ বলল।
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। কিন্তু ভয় লাগে, যদি মা শুনে ফেলে।”
আমি অবাক হলাম। আরাশও একই অনুভূতি করে!
হ্যাপি রান্নাঘর থেকে বলল, “তোমরা দুজনেই রাতে ফ্রিজ খোলো। আমি শুনি।”
আরাশ আর আমি দুজনেই লজ্জা পেলাম।
“তুমি কিছু বল না কেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“কী বলব? ফ্রিজ তো তোমাদেরই। যখন খুশি খুলতে পার।”
কিন্তু সমস্যা সেখানে নয়। সমস্যা এই অপরাধবোধে।
কেন আমি নিজের ঘরে রাতে ফ্রিজ খুলতে গিয়ে চোরের মতো অনুভব করি?
কেন আমার মনে হয় এটা একটা গোপন কাজ?
হয়তো কারণ সমাজ আমাদের শেখায় – রাতে খাওয়া খারাপ। রাতে খাওয়া মানে অনিয়ম। অসংযম।
কিন্তু আমি তো অসংযমী নই। আমি শুধু তৃষ্ণার্ত ছিলাম। আর একটা আপেল খেয়েছি।
তবুও কেন এই লজ্জা?
আমি বুঝলাম – আমাদের খাবারের সাথে এতো আবেগ জড়িয়ে গেছে যে, খাওয়াটাই একটা নৈতিক কাজ হয়ে গেছে।
ভালো খাবার মানে নৈতিক। খারাপ খাবার মানে অনৈতিক। দিনের বেলা খাওয়া মানে স্বাভাবিক। রাতে খাওয়া মানে অস্বাভাবিক।
কিন্তু এই নিয়মগুলো কে বানিয়েছে?
আমি ঠিক করলাম – আগামী রাতে যদি ফ্রিজ খুলতে হয়, তবে আর লুকিয়ে খুলব না। স্বাভাবিকভাবে খুলব।
কিন্তু সেই রাতে যখন আবার ফ্রিজ খুললাম, তখনও সেই অপরাধবোধ এল।
হয়তো এই অনুভূতি এতো গভীরে গেঁথে গেছে যে সহজে যাবে না।
হয়তো আমি সারাজীবনই নিজের ঘরে রাতের চোরের মতো ফ্রিজ খুলব।
একটু ভাবনা রেখে যান