রাত তিনটা বেজে গেছে। হ্যাপি আর আরাশ গভীর ঘুমে। আমি একা জেগে আছি। চারিদিকে নিস্তব্ধতা। এমন নিস্তব্ধতা যেন পৃথিবী থেমে গেছে।
আমি বারান্দায় বসে আছি। আকাশে তারা। রাস্তায় কেউ নেই। শুধু আমি। আর আমার চিন্তা।
“হায়দার,” আমি নিজেকে ডাকলাম। “কী করছো?”
“বসে আছি।”
“কেন ঘুমাচ্ছো না?”
“ঘুম আসছে না।”
“কিসের চিন্তা?”
আমি চুপ হয়ে গেলাম। কিসের চিন্তা? সব কিছুর। কিছুরই না। জীবন নিয়ে। মৃত্যু নিয়ে। অর্থ নিয়ে। অনর্থ নিয়ে।
“তুমি কি ভয় পাও?” আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম।
“হ্যাঁ।”
“কীসের ভয়?”
“ব্যর্থতার। আরাশের সামনে মুখ দেখাতে না পারার। হ্যাপির কাছে মাথা নিচু করার।”
“কিন্তু তুমি তো এখনো আছো। লড়াই করছো।”
“হ্যাঁ। কিন্তু কতদিন? কত দূর পর্যন্ত?”
আমি চাঁদের দিকে তাকালাম। চাঁদ নিরব। কিন্তু সে কি আমার কথা শুনছে? নাকি সেও একা? তারও কি এমন রাত আছে যখন সে নিজের সাথে কথা বলে?
“হায়দার,” আমি আবার বললাম, “তুমি কি সুখী?”
“জানি না। সুখ মানে কী?”
“যখন আরাশ হাসে, তখন কেমন লাগে?”
“ভালো লাগে। খুব ভালো।”
“তাহলে তুমি সুখী।”
“কিন্তু সুখ তো ক্ষণস্থায়ী। আরাশের হাসি মিলিয়ে গেলে আবার সেই চিন্তা।”
“তাহলে সুখ কি আসলে ক্ষণস্থায়ী জিনিস? নাকি আমরা সুখকে স্থায়ী করার ভুল চেষ্টা করি?”
আমি এই প্রশ্নের উত্তর জানি না। কেউ জানে না। হয়তো এটাই জীবনের রহস্য।
“তুমি কি একা?” আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম।
“এই মুহূর্তে? হ্যাঁ।”
“কিন্তু একা থাকতে ভালো লাগে?”
“হ্যাঁ। একা থাকলে নিজেকে শুনতে পাই। অন্যদের সামনে আমি যেমন, একা থাকলে আমি আসলে যেমন।”
“তুমি আসলে কেমন?”
আমি ভাবলাম। আমি আসলে কেমন? ভীরু? সাহসী? দুর্বল? শক্তিশালী? নাকি এই সবগুলোর মিশ্রণ?
“আমি একটা প্রশ্ন,” আমি বললাম। “একটা হাঁটা প্রশ্ন। যে নিজেকে নিয়েই প্রশ্ন করে।”
“এটা কি খারাপ?”
“জানি না। কিন্তু এটাই আমি। প্রশ্ন করাই আমার স্বভাব।”
আমি উঠে দাঁড়িয়ে রেলিংয়ে হাত রাখলাম। নিচে রাস্তা। ওপরে আকাশ। আমি মাঝখানে। এই অবস্থানটা কেমন পরিচিত। সবসময় মাঝখানে। না ওপরে, না নিচে।
“হায়দার,” আমি বললাম, “তুমি কি স্বার্থপর?”
“হয়তো। আমি আমার পরিবারের কথা ভাবি। আমার সুখের কথা ভাবি।”
“কিন্তু অন্যদের কথাও তো ভাবো।”
“ভাবি। কিন্তু প্রথমে নিজের পরিবার। এটা কি ভুল?”
“জানি না। হয়তো এটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেকে নিজের বৃত্ত থেকে শুরু করে।”
একটা কুকুর ডাকল কোথাও দূরে। রাতের নিস্তব্ধতায় সেই ডাক প্রতিধ্বনিত হলো। আমি ভাবলাম—সেই কুকুরটাও কি একা? সেও কি কারো জন্য ডাকছে?
“তুমি কি আল্লাহকে বিশ্বাস করো?” আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম।
“হ্যাঁ।”
“তাহলে এত চিন্তা কেন?”
“কারণ আল্লাহ্ হয়তো চান যে আমি চেষ্টা করি। শুধু বসে না থেকে।”
“কিন্তু ভবিষ্যৎ তো তার হাতে।”
“তাহলে বর্তমান আমার হাতে। আর আমি বর্তমানেই বাঁচি।”
আমি এই কথাটা বলে নিজেই অবাক হলাম। আমি বর্তমানে বাঁচি? নাকি ভবিষ্যতের চিন্তায় বর্তমান নষ্ট করি?
“হায়দার,” আমি বললাম, “তুমি এই মুহূর্তে কী অনুভব করছো?”
আমি একটু ভাবলাম। এই মুহূর্তে কী অনুভব করছি? ভয়? দুশ্চিন্তা? নাকি…?
“শান্তি,” আমি বললাম। “এই নিস্তব্ধতায় একটা শান্তি আছে।”
“কেন?”
“কারণ এই মুহূর্তে কোনো দায়িত্ব নেই। কোনো প্রত্যাশা নেই। আমি শুধু আছি।”
“তাহলে এই ‘শুধু থাকা’টাই কি যথেষ্ট?”
আমি এই প্রশ্নের উত্তর ভেবে পেলাম না। হয়তো পাওয়ার দরকার নেই। হয়তো প্রশ্ন করাই যথেষ্ট।
একটা বাতাস এলো। আমার চুলে খেলে গেল। আমি চোখ বন্ধ করে সেই বাতাস অনুভব করলাম। এই বাতাস কোথা থেকে এলো? কোথায় যাবে? আমার মতো সেও কি পথহারা?
“তুমি কি পথহারা?” আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম।
“জানি না। পথ মানে কী? গন্তব্য মানে কী?”
“যেখানে তুমি যেতে চাও।”
“আমি কোথায় যেতে চাই?”
আমি ভাবলাম। আমি কোথায় যেতে চাই? স্বর্গে? নাকি শুধু একটা ভালো জায়গায়? যেখানে আরাশ খুশি। হ্যাপি নিরাপদ। আমি স্বস্তিতে।
“হয়তো পথ মানে গন্তব্য নয়,” আমি বললাম। “পথ মানে যাত্রা। আর আমি যাত্রী।”
রাত আরো গভীর হয়েছে। কিন্তু আমার আর ঘুম পাচ্ছে না। এই কথোপকথন, এই নিস্তব্ধতা—এতে একটা নেশা আছে।
“হায়দার,” আমি শেষবারের মতো বললাম, “তুমি কি ভালো আছো?”
“এই মুহূর্তে? হ্যাঁ।”
“তাহলে এটাই যথেষ্ট।”
“কেন?”
“কারণ এই মুহূর্তই সত্যি। বাকি সব কল্পনা।”
আমি ভেতরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালাম। কিন্তু যাওয়ার আগে একবার তাকালাম আকাশের দিকে।
“ধন্যবাদ,” আমি বললাম। কাকে বললাম, জানি না। হয়তো রাতকে। হয়তো নিস্তব্ধতাকে। হয়তো নিজেকে।
আর হয়তো সেই মহান সত্তাকে, যিনি আমাকে নিজের সাথে কথা বলার সুযোগ দিয়েছেন।
একটু ভাবনা রেখে যান