ব্লগ

রেসিপির মায়াজাল

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

ইউটিউবের ভিডিওটা দেখে মনে হয়েছিল বিরিয়ানি রান্না করা সবচেয়ে সহজ কাজ। “মাত্র সাতটি উপকরণ, ত্রিশ মিনিটে তৈরি।” শেফটি এমনভাবে বলছিল যেন এটা ডাল-ভাত রান্নার চেয়েও সহজ। আমি ভেবেছিলাম, আজ হ্যাপিকে চমকে দেব।

বাজার করতে গিয়েই প্রথম বিপদ। ভিডিওতে যে বাসমতি চালের প্যাকেট দেখিয়েছিল, সেটা এই বাজারে নেই। দোকানদার বলল, “আরেক ধরনের নিন।” আমি ভাবলাম, চাল তো চালই। কি আর এমন হবে।

রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে মনে হল, আমি যেন একটা বৈজ্ঞানিক গবেষণাগারে ঢুকে পড়েছি। ভিডিওতে যেটা “এক চিমটি” বলেছিল, সেটা কতটুকু? আমার চিমটি নাকি শেফের চিমটি? মসলার পরিমাণ নিয়ে এত দ্বিধা যে মনে হল গণিতের অঙ্ক কষছি।

হ্যাপি পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “তুমি কী করছ?” আমি গর্বের সাথে বললাম, “বিরিয়ানি বানাচ্ছি। দেখবে কেমন হয়।” তার মুখে একটা সন্দেহের ছায় দেখলাম। সেটা দেখে আমার আত্মবিশ্বাস আরো বেড়ে গেল।

প্রথম সমস্যা হল গোশত। ভিডিওতে দেখিয়েছিল কিভাবে সুন্দর করে কাটতে হয়। কিন্তু আমার হাতে ছুরিটা যেন একটা অচেনা যন্ত্র। গোশতের টুকরোগুলো হয়ে গেল একেকটা আলাদা আকৃতির।

তারপর মসলা বাটার পালা। ভিডিওতে দুই মিনিটে হয়ে গিয়েছিল। আমার লাগল বিশ মিনিট। আর সেই বাটা মসলা দেখতে কেমন যেন ভয়ংকর রকম পাতলা হয়ে গেছে।

চাল সেদ্ধ করার সময় বুঝলাম ভিডিওর শেফের হাতে যাদু আছে। তার চাল হয়েছিল ফুরফুরে, আমার হয়েছে কেমন যেন আঠালো। জল কম দিয়েছি নাকি বেশি, সেটাও বুঝতে পারলাম না।

সবচেয়ে বড় বিপদ হল ডামে রান্না করার সময়। ভিডিওতে একটা সুন্দর ধোঁয়া উঠছিল পাত্র থেকে। আমার পাত্র থেকে উঠছে কালো ধোঁয়া। আর একটা পোড়া গন্ধ।

আরাশ এসে নাক কুঁচকে বলল, “আব্বু, এটা কি বিরিয়ানি নাকি কিছু পুড়িয়ে ফেলেছেন?” আমার গর্বের বাতি নিভে গেল।

ত্রিশ মিনিটের বদলে দুই ঘন্টা লেগে গেল। আর শেষে যেটা হল, সেটা বিরিয়ানি বলা যায় কিনা সন্দেহ। হ্যাপি স্বাদ নিয়ে বলল, “খারাপ না।” কিন্তু তার মুখভাব বলছে অন্য কথা।

রাতে শুয়ে ভাবলাম, রেসিপি বিডিও বানানোর সময় তারা কি দেখায় না যেসব ভুল হতে পারে? নাকি আমারই কোনো সমস্যা আছে যে সহজ কাজও আমার কাছে কঠিন লাগে?

আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “আমি কি এতটাই অপদার্থ যে একটা রেসিপি ফলো করতে পারি না?” মনে হয় যেন আল্লাহ বলছেন, “প্রতিটি মানুষেরই নিজস্ব দক্ষতা আছে। রান্না হয়তো তোমার না।”

কিন্তু তাহলে আমার দক্ষতা কোথায়? অফিসের কাজেও তো তেমন পারদর্শিতা নেই। পরিবার সামলানোয়ও নিজেকে যথেষ্ট মনে হয় না। আমি আসলে কী পারি?

হয়তো এই প্রশ্নটাই আমার জীবনের মূল চ্যালেঞ্জ। কী পারি, কী পারি না – সেটা খুঁজে বের করা। আর যা পারি না, সেটা নিয়ে খুব হতাশ না হয়ে মেনে নেওয়া।

পরদিন সকালে হ্যাপি সাধারণ খিচুড়ি বানাল। খেতে খেতে মনে হল, এটাও তো একটা রান্না। এটাও তো দক্ষতা। হয়তো বিরিয়ানি আমার জন্য না, কিন্তু খিচুড়ির স্বাদ বুঝি।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *