রিমোট কন্ট্রোল। এই ছোট্ট যন্ত্রটাই আমাদের বাড়ির সবচেয়ে বড় যুদ্ধের কারণ। আমি, আমার বড় ভাই আর ছোট বোন – তিনজনের মধ্যে রিমোট নিয়ে যে লড়াই হত, সেটা ছিল তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে কম ভয়ানক নয়।
সন্ধ্যা ৭টা। টিভির সামনে তিনজন বসা। বড় ভাই খবর দেখতে চায়। আমি কার্টুন দেখতে চাই। ছোট বোন সিনেমা দেখতে চায়। আর রিমোট? সেটা আছে বড় ভাইর হাতে। কারণ সে সবার বড়।
“আমি খবর দেখব,” বড় ভাই ঘোষণা দেয়। আমি প্রতিবাদ করি, “কেন? তুমি তো সারাদিন দেখেছ।” ছোট বোন যোগ দেয়, “আমি আগে এসেছি।” কিন্তু বড় ভাইর হাতে যখন রিমোট, তখন আমাদের সব যুক্তি অসার।
রিমোট কেড়ে নেওয়ার জন্য আমাদের ছিল বিভিন্ন কৌশল। প্রথম কৌশল – সরাসরি আক্রমণ। লাফিয়ে পড়ে রিমোট ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। কিন্তু বড় ভাই শক্তিশালী। সহজে হার মানে না।
দ্বিতীয় কৌশল – মায়ের কাছে নালিশ। “মা, ভাই রিমোট দিচ্ছে না।” মা আসেন, “সবাই মিলে দেখ। ঝগড়া করো না।” কিন্তু মা চলে গেলেই আবার সেই একই অবস্থা।
তৃতীয় কৌশল – চুপিচুপি রিমোট নিয়ে যাওয়া। বড় ভাই যখন একটু অন্যদিকে তাকায়, তখন রিমোট হাতিয়ে নেওয়া। কিন্তু এই কৌশল খুব বেশিক্ষণ কাজ করে না।
চতুর্থ কৌশল – দেন-দরবার। “ভাই, তোমার জন্য চা নিয়ে আসি। রিমোটটা দাও।” অথবা “আমি তোমার হোমওয়ার্ক করে দেব।” কখনো কখনো এই কৌশল কাজ করত।
সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হত শুক্রবার সন্ধ্যায়। কারণ সেদিন একসাথে কয়েকটা ভালো প্রোগ্রাম থাকত। বড় ভাই ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে চায়। আমি বিটিভিতে হিন্দি সিনেমা দেখতে চাই। ছোট বোন বাংলা নাটক দেখতে চায়।
এই যুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হত বালিশ, কুশন, এমনকি চপ্পল। “রিমোট দে!” এই আর্তনাদে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠত। প্রতিবেশীরা বুঝত আমাদের বাড়িতে রিমোট যুদ্ধ শুরু হয়েছে।
বাবা-মা অনেক সময় বিরক্ত হয়ে টিভি বন্ধ করে দিতেন। “এত ঝগড়া করলে কেউ দেখবে না।” তখন আমরা তিনজন একসাথে মায়া পিটি করতাম। “মা, আমরা আর ঝগড়া করব না।”
কিন্তু এই প্রতিজ্ঞা বেশিক্ষণ টিকত না। পরের দিনই আবার সেই একই যুদ্ধ।
আমাদের মধ্যে একটা অলিখিত নিয়ম ছিল – যে প্রথমে টিভির সামনে বসবে, সে রিমোট পাবে। এই নিয়মের কারণে সন্ধ্যা ৬টা থেকেই আমরা টিভির সামনে অবস্থান নিতাম।
ছোট বোনের একটা বিশেষ কৌশল ছিল – কান্না। যখন কিছুতেই রিমোট পেত না, তখন কেঁদে ফেলত। “আমি কিছুই দেখতে পারি না।” এই কান্নায় মা-বাবা দ্রবীভূত হয়ে রিমোট তার হাতে দিয়ে দিতেন।
বড় ভাইর কৌশল ছিল জ্ঞানগর্ভ যুক্তি। “আমি খবর দেখছি। এটা জরুরি। তোরা শুধু বিনোদন দেখিস।” যেন বিনোদন দেখা কোনো পাপ।
আমার কৌশল ছিল গণতন্ত্র। “আমরা ভোট দিয়ে ঠিক করি কী দেখব।” কিন্তু ভোটাভুটিতে সবসময় আমি হেরে যেতাম।
এই রিমোট যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার হত রিমোট নিজেই। মাঝে মাঝে টেনে-হিঁচড়ে রিমোটের বোতাম বেরিয়ে যেত। অথবা ব্যাটারি খসে পড়ত।
কখনো কখনো রিমোট হারিয়ে যেত। তখন সবাই মিলে খুঁজতাম। সোফার নিচে, বালিশের ভিতর, টেবিলের তলায়। রিমোট খোঁজার সময়টা ছিল একমাত্র সময় যখন আমরা একসাথে কাজ করতাম।
আল্লাহর কাছে মনে হয় এই রিমোট যুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে অনেক কিছু। ধৈর্য, কৌশল, আপস। জীবনেও তো এরকম অনেক “রিমোট” আছে যার জন্য প্রতিযোগিতা করতে হয়।
এখন আরাশ আমাদের ঘরের একমাত্র সন্তান। তার রিমোট যুদ্ধের অভিজ্ঞতা হবে না। কিন্তু কখনো কখনো মনে হয়, সে একটা গুরুত্বপূর্ণ জীবনের পাঠ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
রিমোট যুদ্ধ শুধু টিভি চ্যানেল পরিবর্তনের যুদ্ধ ছিল না। এটা ছিল নিয়ন্ত্রণের যুদ্ধ। ক্ষমতার যুদ্ধ। এবং পরিবারের মধ্যে নিজের অবস্থান তৈরির যুদ্ধ।
আজ যখন আরাশকে রিমোট দিয়ে দিই, মনে পড়ে যায় আমাদের সেই পুরনো দিনগুলো। হয়তো সেই যুদ্ধের দিনগুলো আমাদের পারিবারিক বন্ধনকে আরো মজবুত করেছে। যুদ্ধ করলেও ভালোবাসা কমেনি।
একটু ভাবনা রেখে যান