রাত তিনটার সময় চোখ খুলে গেল। হ্যাপি আর আরাশ গভীর ঘুমে। বাইরে কোনো শব্দ নেই, কেবল দূরের কোথাও একটা কুকুর ডাকছে। এই নিস্তব্ধতায় উঠে বসলাম বিছানায়। আজ আবার সেই অস্থিরতা – যেন কেউ ভিতর থেকে ডাকছে।
ওজু করে জায়নামাজে দাঁড়ালাম। তাহাজ্জুদের নামাজে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো দেখানোর ব্যাপার নেই। কেবল আমি আর আমার রব। কিন্তু সেজদায় গিয়েই মনে হলো – আমি কি সত্যিই একা? নাকি আমার ভিতরে আরেকজন আছে, যে আমার চেয়েও বেশি জানে আমার কথা?
সেজদায় কপাল মেঝেতে রেখে শুনতে পেলাম নিজের হৃদস্পন্দন। প্রতিটি ধুকপুকানিতে যেন একটা প্রশ্ন – “তুমি কি আসলেই আল্লাহর কাছে এসেছো, নাকি নিজের কাছে?”
উঠে বসে হাত তুলে দোয়া করতে গেলাম। কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। কেবল অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এই অশ্রুর মানে কী? দুঃখ? অনুশোচনা? নাকি এমন একটা আনন্দ যার কোনো নাম নেই?
মনে পড়ল মায়ের কথা। তিনি বলতেন, “দোয়া মানে চাওয়া নয়, বরং নিজেকে খুলে দেওয়া।” কিন্তু আজ এই নিরবতায় বুঝলাম – আমি নিজেকে খুলে দিতে কতটা ভয় পাই। কারণ খুলে দিলে তো দেখা যাবে ভিতরে কী আছে। দেখা যাবে সেই সব প্রশ্ন, সেই সব সংশয়, যা আমি দিনের আলোয় লুকিয়ে রাখি।
আরাশের মুখটা মনে এলো। সে গতকাল জিজ্ঞেস করেছিল, “বাবা, আল্লাহ কি আমাদের মনের কথা শুনতে পান?” আমি বলেছিলাম, “হ্যাঁ।” কিন্তু আজ রাতে প্রশ্ন জাগছে – আল্লাহ যদি সত্যিই শুনতে পান, তাহলে আমার এই ভাঙা মনের আওয়াজ তিনি কেমন করে সহ্য করেন?
হাত তুলে রইলাম আকাশের দিকে। অন্ধকার ঘরে চাঁদের আলো এসে পড়েছে জানালা দিয়ে। এই আলোর মতোই কি আল্লাহর রহমত আসে? নিঃশব্দে, অলক্ষ্যে?
হৃদয়ের গভীর থেকে যেন কেউ বলল – “তুমি যা চাও, সেটা পাওয়ার জন্য দোয়া করো না। বরং যা দেওয়া হয়েছে, সেটা বোঝার জন্য দোয়া করো।” কিন্তু এই কণ্ঠস্বর কার? আমার নিজের? নাকি আমার ভিতরে লুকিয়ে থাকা সেই অংশের, যে আমার চেয়ে পরিষ্কার দেখতে পায়?
হ্যাপি ঘুমের মধ্যে নড়ে উঠল। আমি ফিসফিস করে বললাম, “ইয়া আল্লাহ, আমার পরিবারকে ভালো রাখো।” কিন্তু সাথে সাথেই মনে হলো – ভালো রাখা মানে কী? আমি যা ভাবি, সেটা? নাকি তুমি যা জানো ভালো, সেটা?
নামাজ শেষ করে বসে রইলাম। নিরবতা এখন আর ভীতিকর লাগছে না। বরং মনে হচ্ছে এই নিরবতাই আসল কথোপকথন। এখানে কোনো শব্দের দরকার নেই, কোনো ব্যাখ্যার দরকার নেই। কেবল অনুভব করতে হয় – আমি এক, অথচ একা নই।
হয়তো এটাই তাহাজ্জুদের আসল মানে। নিজের সাথে, নিজের হৃদয়ের সাথে, আর সেই মহান সত্তার সাথে একটা নিঃশব্দ কথোপকথন। যেখানে প্রশ্নের উত্তর মেলে না বটে, কিন্তু প্রশ্ন করার সাহসটুকু পাওয়া যায়। আর হয়তো সেটাই যথেষ্ট।
ফজরের আজান হতে এখনো অনেক দেরি। কিন্তু আমি আর ঘুমাতে পারব না। এই নিরবতায় এখন আরেকটু বসে থাকি। হৃদয়ের সাথে আরেকটু কথা বলি। দেখি আর কী শোনায় সে।
একটু ভাবনা রেখে যান