ব্লগ

রোজার বাজার

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

রমজান এলেই ফেসবুক ভরে যায় আধ্যাত্মিক পোস্টে। “সবর করুন, আল্লাহ দেখছেন।” “রোজা শুধু খাওয়া বন্ধ নয়, মনের পবিত্রতা।” সাথে থাকে সুন্দর ক্যালিগ্রাফি, নরম আলোর ছবি।

আমি স্ক্রল করতে করতে দেখি একটা পোস্ট। “রমজানে আত্মশুদ্ধির এই পবিত্র সময়ে…” পুরো প্যারাগ্রাফ। শেষে ছোট্ট করে লেখা, “#Sponsored #XYZRestaurant #IftatSpecial”।

আমি থমকে গেলাম।

একই মানুষ সকালে পোস্ট করেছেন, “দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করুন।” বিকেলে ট্যাগ করেছেন একটা রেস্টুরেন্টের ইফতার অফার।

কিন্তু তাঁকে দোষ দেবো কেন? উনি তো চেষ্টা করছেন বেঁচে থাকার। ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে এটাই উনার পেশা। ব্র্যান্ড স্পন্সরশিপ নিয়ে ইফতারের খরচ তুলছেন।

তাহলে প্রশ্ন কী? উনি ভুল, নাকি আমার দেখার চোখে সমস্যা?

হয়তো উনি মনে করেন, ভালো কথা বলাটাই গুরুত্বপূর্ণ। সেটা monetize করা নিয়ে আল্লাহর কোনো আপত্তি নেই। মানুষের উপকার হচ্ছে, উনারও আয় হচ্ছে। Win-win।

নাকি এখানে একটা সূক্ষ্ম সমস্যা আছে?

রমজানের কোরআন তেলাওয়াতে বলা হয়, “তোমরা আমার আয়াত অল্প মূল্যে বিক্রি করো না।” কিন্তু এটা কি সেই ক্ষেত্রে পড়ে?

উনি তো কোরআনের আয়াত বিক্রি করছেন না। নিজের মত দিচ্ছেন। সেটার জন্য পারিশ্রমিক নিচ্ছেন।

তাহলে আমার অস্বস্তি কেন?

হয়তো কারণ এটা। যখন কেউ আধ্যাত্মিক কথা বলে, আমি ধরে নিই তাঁর কোনো material interest নেই। কিন্তু স্পন্সর ট্যাগ দেখে বুঝি, আছে।

কিন্তু এটা কি আমার সমস্যা? আমি কেন ধরে নিচ্ছি আধ্যাত্মিকতা আর অর্থের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না?

ইমামরা কি মসজিদ থেকে বেতন নেন না? ধর্মীয় বই লেখকরা কি রয়ালটি পান না? তাহলে ফেসবুক পোস্টের স্পন্সরশিপ আলাদা কেন?

নাকি পার্থক্য audience এর মধ্যে? মসজিদে গেলে আমি জানি ইমাম সাহেবের বেতন হয়। কিন্তু ফেসবুকে পোস্ট দেখে আমি ভাবি উনি বিনা স্বার্থে লিখছেন।

তাহলে কি স্বচ্ছতার বিষয়? যদি উনি শুরুতেই লিখতেন, “আমি এই পোস্টের জন্য পেমেন্ট নিচ্ছি,” তাহলে কি আপত্তি কম থাকতো?

কিন্তু সেটা করলে তো কেউ পড়বে না। মানুষ জানে influencer মার্কেটিং কী। কিন্তু যখন আধ্যাত্মিক কন্টেন্টের সাথে commercial ট্যাগ দেখে, মনে হয় কিছু একটা ভুল।

আমার নিজের দিকে তাকাই। আমি কি সৎ? অফিসে যখন বস এর সামনে মিথ্যা হাসি হাসি, সেটা কি ভণ্ডামি? বেতনের জন্য যখন এমন কাজ করি যা আমার বিবেকে লাগে, সেটা কি বিক্রি?

তাহলে উনার সাথে আমার পার্থক্য কোথায়? উনি আধ্যাত্মিক কন্টেন্ট বিক্রি করেন, আমি আমার সময় বিক্রি করি।

নাকি পার্থক্য এখানে যে আমি মানুষকে বলি না, “আমার কাজ পবিত্র।” কিন্তু উনি বলেন?

তাহলে আসল সমস্যা কি authenticity নিয়ে? উনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন যা লেখেন? নাকি শুধু audience engage করানোর জন্য লেখেন?

কিন্তু এটা আমি কীভাবে জানবো? আমি কি তাঁর মনের ভেতর ঢুকতে পারি?

হয়তো উনি সত্যিই ধার্মিক। স্পন্সরশিপ নিয়েও সৎ থাকার চেষ্টা করেন। ভাবেন, “আমার ফলোয়াররা ভালো রেস্টুরেন্টে ইফতার করুক।”

নাকি উনি জানেন এটা contradiction, কিন্তু টাকার জন্য করেন?

আমি জানি না। আমি শুধু জানি, এই দেখে আমার ভেতরে একটা অস্বস্তি হয়।

হয়তো সেই অস্বস্তি আমার নিজের guilt থেকে। আমিও তো compromise করি। আমিও তো বেঁচে থাকার জন্য কিছু কিছু কাজ করি যা আদর্শগতভাবে perfect নয়।

তাহলে আমি কেন তাঁকে judge করছি?

নাকি judge করাটাই ভুল? হয়তো আমার উচিত তাঁর কন্টেন্ট নিয়ে ভাবা, তাঁর motivation নিয়ে নয়। যদি কথাগুলো ভালো হয়, তাহলে সেটাই যথেষ্ট।

কিন্তু তাহলে integrity এর কী হবে? message আর messenger কি আলাদা?

আমি জানি না কোনটা ঠিক। আমি শুধু জানি, পৃথিবী জটিল। সবাই বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। কেউ কারখানায়, কেউ অফিসে, কেউ ফেসবুকে।

হয়তো আমার প্রশ্ন এটা হওয়া উচিত – আমি নিজে কী করবো? যদি আমার কাছে হাজার ফলোয়ার থাকতো, আমি কি স্পন্সরশিপ নিতাম?

সৎ উত্তর? সম্ভবত নিতাম। আর তখন নিজেকে justify করার জন্য হাজারটা যুক্তি খুঁজে বের করতাম।

হয়তো এটাই মানুষ। সবাই নিজের compromise এর সাথে বাঁচে।

কিন্তু কথাটা বলা আর মেনে নেওয়া – দুটো আলাদা কথা।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *