ব্লগ

রক্তের সম্পর্কে পরের মতো দূরত্ব

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

বড় ভাই আজ এলো বাড়িতে। আমাদের মধ্যে মাত্র তিন বছরের পার্থক্য। একই মায়ের পেট থেকে জন্ম। একই ঘরে বড় হওয়া। কিন্তু আমাদের মধ্যে যে দূরত্ব, সেটা মহাসাগরের চেয়েও গভীর।

আমরা কথা বলি। কিন্তু কথার ভিতরে কোনো আত্মীয়তা নেই। আমাদের আলাপ যেন দুজন অচেনা মানুষের মতো।


ছোটবেলায় আমরা একসাথে খেলতাম। একই বিছানায় ঘুমাতাম। একই খাবার খেতাম। ভাই ছিল আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ।

কিন্তু কখন থেকে এই দূরত্ব শুরু হলো? কোন মুহূর্তে আমরা দুজন আলাদা পথে হাঁটতে শুরু করলাম?

হয়তো শুরু হয়েছিল যখন আমরা বড় হতে শুরু করলাম। যখন আমাদের আলাদা পছন্দ তৈরি হলো। আলাদা বন্ধু হলো। আলাদা স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম।

ভাই পড়াশোনায় ভালো ছিল। আমি ছিলাম গড়পড়তা। ভাই সব সময় প্রথম হতো। আমি কোনো না কোনোভাবে পাশ করতাম।

মা-বাবা ভাইকে নিয়ে গর্ব করতেন। আমার ব্যাপারে ছিল একটা হতাশা। সেই হতাশা আমার মধ্যে একটা হীনমন্যতা তৈরি করেছিল।

ভাই যখন চাকরি পেল, আমি তখনও খোঁজ করছিলাম। ভাই যখন বিয়ে করল, আমি তখনও ভাবছিলাম কী করব জীবনে।

এই পার্থক্যগুলো আমাদের মধ্যে একটা দেয়াল তুলে দিল। আমি মনে করতাম ভাই আমাকে ছোট ভাবে। ভাই মনে করত আমি দায়িত্বজ্ঞানহীন।

মায়ের মৃত্যুর পর আমাদের দূরত্ব আরো বেড়েছে। মায়ের শেষ দিনগুলোতে ভাই অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিল। আমি ছিলাম হাসপাতালে। ভাই মনে করে আমি তাকে দোষারোপ করি। আমি মনে করি ভাই দায়িত্ব এড়িয়ে গেছে।

আসলে আমাদের কেউ কাউকে দোষারোপ করি না। কিন্তু একটা অস্বস্তি আছে। একটা কথা না বলা কষ্ট।

আজ ভাই এসে বলল, “কেমন আছিস?”

আমি বললাম, “ভালো আছি।”

কিন্তু আমি ভালো নেই। আমার অনেক সমস্যা। আর্থিক টানাপোড়েন। চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা। কিন্তু ভাইকে বলতে পারি না।

কেন পারি না? কারণ আমি জানি ভাই আমাকে বলবে, “আমি তো বলেছিলাম সেই কাজটা নিতে।” অথবা, “তুই যদি আমার কথা শুনতিস।”

ভাই আমাকে উপদেশ দেবে। কিন্তু সান্ত্বনা দেবে না। কারণ ভাই মনে করে উপদেশই যথেষ্ট।

আমার প্রয়োজন কারো কাছে মন খোলা। কিন্তু ভাইয়ের কাছে মন খুলতে ভয় হয়। মনে হয় ভাই আমাকে বিচার করবে।

ভাইয়ের নিজের পরিবার আছে। স্ত্রী, দুই সন্তান। তাদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আমার পরিবারের কথা জিজ্ঞেস করে আনুষ্ঠানিকতা বজায় রাখার জন্য।

আমি বুঝি, রক্তের সম্পর্ক মানেই ঘনিষ্ঠতা নয়। ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় মনের মিল থেকে। সময় দেওয়া থেকে। একে অপরকে বোঝার চেষ্টা থেকে।

আমরা ভাই-ভাই, কিন্তু আমাদের মধ্যে সেই চেষ্টা নেই।

ভাই যখন চলে যায়, আমি একটা খালি খালি লাগে। মনে হয় আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ আসলে অনেক দূরে।

আমি চাই ভাইয়ের সাথে আবার সেই পুরনো সম্পর্ক ফিরে পাক। কিন্তু কীভাবে? কোন কথা দিয়ে শুরু করব?

“ভাই, আমার কষ্টের কথা শুনবে?” এটা বলতে পারি না। গর্বে বাধে।

“ভাই, তোর সাথে আড্ দিতে ইচ্ছে করে।” এটাও বলতে পারি না। মনে হয় ভাই ব্যস্ত।

আমরা দুজনেই অপেক্ষা করি কে আগে এগিয়ে আসবে। কিন্তু কেউই আসি না।

হয়তো এই দূরত্বের জন্য আমরা দুজনেই দায়ী। আমি মনে করি ভাই আমাকে বোঝে না। ভাই মনে করে আমি তার কথা শুনি না।

কিন্তু আসল কথা হলো, আমরা দুজনেই চেষ্টা বন্ধ করে দিয়েছি। আমরা ধরে নিয়েছি যে আমাদের মধ্যে পার্থক্য আছে।

আমি জানি, এই দেয়াল ভাঙা সম্ভব। কিন্তু প্রয়োজন দুজনের চেষ্টা। একজনের চেষ্টায় হবে না।

আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, পরবার ভাই এলে আমি চেষ্টা করব। আমি তাকে বলব আমার সমস্যার কথা। আমার মনের কথা।

হয়তো ভাইও অপেক্ষায় আছে আমার এগিয়ে আসার।

কারণ শেষ পর্যন্ত, ভাই তো ভাইই। রক্তের সম্পর্ক হয়তো দূরত্ব তৈরি করতে পারে না। তৈরি করে আমাদের অহংকার।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *