আজ আরাশ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, আমি কেন বজ্রপাত দেখলে এত ভয় পাই? এমনকি দূর থেকে বিজলিও।”
আমি থমকে গেলাম। সত্যিই তো। আরাশ ছোটবেলা থেকেই বজ্রপাতের আওয়াজে কাঁপতে থাকে। বিজলি চমকালে লুকিয়ে পড়ে।
“তোমার দাদুও বজ্রপাত ভয় পেতেন,” আমি বললাম। “আমিও ছোটবেলায় খুব ভয় পেতাম।”
“কেন?”
আমি জানি না কেন। কিন্তু মনে হয় এই ভয়টা আমাদের পরিবারে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম চলে আসছে।
হ্যাপি বলল, “হয়তো তোমাদের কোনো পূর্বপুরুষের বিজলি নিয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছিল।”
আমার মনে পড়ল দাদুর গল্প। তিনি বলতেন, তার দাদু এক ঝড়ের রাতে বিজলিতে মারা গিয়েছিলেন। খেতে কাজ করার সময়। সেই থেকে আমাদের পরিবারে বজ্রপাতের একটা আতঙ্ক।
কিন্তু এই ভয় কি শুধু শোনা গল্পের কারণে? নাকি আরো গভীর কিছু?
আমি একটা বই পড়েছিলাম। সেখানে লেখা ছিল—পূর্বপুরুষদের ট্রমা ডিএনএ-তে সংরক্ষিত হতে পারে। তাদের অভিজ্ঞতা আমাদের জিনে কোড হয়ে থাকে।
যেমন ইঁদুরের উপর পরীক্ষা। একদল ইঁদুরকে একটা গন্ধের সাথে বিদ্যুৎ দিয়ে শক দেওয়া হল। তারা সেই গন্ধে ভয় পেতে শুরু করল। তাদের বাচ্চারাও সেই গন্ধে ভয় পেল। অথচ তাদের কখনো শক দেওয়া হয়নি।
ভয় বংশগত হয়েছে।
তাহলে কি আমার পরপর দাদুর বিজলির ভয় আমার ডিএনএ-তে এসেছে? সেখান থেকে আরাশের কাছে?
আমি আরো ভাবলাম। আমার বাবার একটা অভ্যাস ছিল। তিনি সবসময় দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখতেন। এমনকি গরমের দিনেও। বলতেন, “নিরাপত্তার জন্য।”
আমিও এই অভ্যাস পেয়েছি। আরাশও লক্ষ করেছি, সে ঘর থেকে বের হলে দরজা বন্ধ করে।
এই সতর্কতা কি আমাদের পূর্বপুরুষদের কোনো বিপদের স্মৃতি? হয়তো তারা এমন পরিবেশে বাস করত যেখানে দরজা খোলা রাখা নিরাপদ ছিল না।
হ্যাপিকে বললাম, “তুমি কি মনে করো আমাদের পূর্বপুরুষদের অভিজ্ঞতা আমাদের মধ্যে থেকে যায়?”
“কেমন অভিজ্ঞতা?”
“যেমন আমাদের এই বিজলির ভয়। আমাদের সতর্কতা। এমনকি আমাদের পছন্দ-অপছন্দও।”
হ্যাপি ভাবল। “হতে পারে। আমার মায়ের পরিবারে সবাই মিষ্টি পছন্দ করে। আমিও, আরাশও।”
“কিন্তু এটা কি শুধু পরিবেশের প্রভাব? নাকি জিনগত?”
আমি ভাবলাম—আমার নানার পরিবার ছিল কৃষক। তারা সূর্যোদয়ের সাথে ওঠত। আমিও ভোর হলেই জেগে যাই। আরাশও। অথচ আমরা কৃষিকাজ করি না।
এই ভোর ভোর ওঠার প্রবণতা কি আমাদের ডিএনএ-তে কোড হয়ে আছে?
আমার দাদুর হাত ছিল খুব দক্ষ। যেকোনো জিনিস ঠিক করতে পারতেন। আমারও হাতের কাজে ভালো লাগে। আরাশও ছোট থেকেই যন্ত্রপাতি ভেঙে-ভেঙে দেখে।
এই কারিগরি দক্ষতা কি বংশগত?
আমি আরাশকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি কখনো অনুভব করো যে তুমি কিছু একটা জানো, কিন্তু কোথায় শিখেছো মনে নেই?”
আরাশ ভেবে বলল, “হ্যাঁ। আমি গান শুনলে কোন রাগে গাওয়া হচ্ছে বুঝতে পারি। কিন্তু কেউ শেখায়নি।”
আমার গায়ে কাঁটা দিল। আমার দাদু ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ। তাবলা বাজাতেন। আমার বাবাও গান ভালোবাসতেন।
তাহলে কি সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসা আমাদের ডিএনএ-তে আছে?
আমি আরো গভীরে ভাবলাম। আমার স্বভাব—প্রশ্ন করা, সন্দেহ করা, গভীরে যাওয়া। আমার বাবাও এরকম ছিলেন। তার বাবাও।
এই জিজ্ঞাসু প্রকৃতি কি আমাদের পারিবারিক বৈশিষ্ট্য?
কিন্তু তাহলে আমি কি আমার নিজের মানুষ? নাকি আমি শুধু আমার পূর্বপুরুষদের সমষ্টি?
রাতে ভাবলাম—যদি আমার মধ্যে আমার দাদু-দাদিদের স্মৃতি থাকে, তাহলে আমার মৃত্যুর পর আমার স্মৃতি আরাশের মধ্যে থাকবে?
হয়তো মৃত্যু মানে সম্পূর্ণ শেষ নয়। হয়তো আমাদের অভিজ্ঞতা, আমাদের ভয়, আমাদের ভালোবাসা—সব কিছু পরের প্রজন্মে চলে যায়।
আমি আরাশের দিকে তাকালাম। তার মধ্যে কি আমার বাবার ছায়া দেখতে পাচ্ছি? আমার দাদুর হাসি?
হয়তো আরাশ শুধু আরাশ নয়। সে আমাদের পুরো বংশের সারাংশ।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—আমি আরাশকে ভালো স্মৃতি দেওয়ার চেষ্টা করবো। যাতে সেই স্মৃতি তার ডিএনএ-তে পজিটিভ কোড হয়ে থাকে।
আমি তাকে ভালোবাসা দেবো। নিরাপত্তা দেবো। আত্মবিশ্বাস দেবো। যাতে পরের প্রজন্মে এগুলো ছড়িয়ে যায়।
হয়তো এভাবেই পূর্বপুরুষদের ট্রমা কাটিয়ে ওঠা যায়। নতুন, ভালো অভিজ্ঞতা দিয়ে পুরনো, খারাপ স্মৃতি মুছে ফেলা।
আমি যদি আরাশকে বজ্রপাতের সময় নিরাপত্তা দিই, হয়তো তার মধ্যে সেই ভয় কমে যাবে। হয়তো তার সন্তানরা আর বিজলি দেখে ভয় পাবে না।
এভাবেই হয়তো প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমরা নিজেদের আরো ভালো করে তুলতে পারি।
কারণ আমাদের ডিএনএ শুধু অতীতের বাহক নয়। এটা ভবিষ্যতের নির্মাতাও।
একটু ভাবনা রেখে যান