টয়লেটে ঢুকে দেখি আমার হাত কাঁপছে। কিন্তু এ আমার হাত নাকি অন্য কারো? হাতটা দেখতে অন্যরকম লাগছে। যেন কেউ রাতে এসে আমার হাত বদলে দিয়ে গেছে।
আয়নায় তাকালাম। সেখানে একজন অপরাধী দাঁড়িয়ে আছে। কী অপরাধ করেছি জানি না। কিন্তু সবাই জানে আমি অপরাধী। এমনকি আমিও জানি।
সিভিটা হাতে নিলাম। “হায়দার আহমেদ” লেখা আছে। কিন্তু এ নাম আমার? নাকি কেউ ভুল করে আমাকে এই নাম দিয়ে দিয়েছে? আমার আসল নাম কী ছিল?
ইন্টারভিউ বোর্ডের কথা ভাবলাম। তিনজন বিচারক বসে থাকবে। কিসের বিচার? আমি জানি না। তারাও জানে না। কিন্তু বিচার হবে। রায় হবে। দোষী সাব্যস্ত হব।
হ্যাপির কথা মনে পড়ল। সে বলেছিল, “তুমি পারবে।” কিন্তু পারব কী? কী করতে পারব? আমি তো জানিই না আমাকে কী করতে হবে। সবাই জানে, শুধু আমি জানি না।
আরাশ জিজ্ঞেস করেছিল, “বাবা, তুমি কি চাকরি পাবে?” আমি বলেছিলাম, “হ্যাঁ।” কিন্তু এটা মিথ্যা। আমি কিছুই পাব না। আমার কিছু পাওয়ার কথা নয়। সবাই জানে এটা।
টাকা গুনে দেখলাম। দুশো টাকা। এই টাকা আমার? নাকি ভুল করে আমার পকেটে চলে এসেছে? হয়তো পুলিশ এসে বলবে, “এই টাকা তোমার না।” আমি বলব, “জানি না কীভাবে এলো।” কেউ বিশ্বাস করবে না।
সময় কীভাবে চলে যায়! দশ মিনিট ছিল, এখন পাঁচ মিনিট। পাঁচ মিনিট পরে শূন্য মিনিট। তারপর কী? তারপর আমাকে একটা ঘরে নিয়ে যাবে। তিনজন মানুষ বসে থাকবে। তারা জানে আমি অপরাধী। আমিও জানি।
হাত ধুলাম। পানি গরম না ঠান্ডা বুঝতে পারলাম না। হয়তো আমার হাত আর অনুভব করতে পারছে না। হয়তো আমি ধীরে ধীরে কিছুই অনুভব করতে পারব না।
দরজার হাতল ধরলাম। ধাতুর হাতল। ঠান্ডা। কিন্তু আমার হাত কাঁপছে। হাতল নিজেও কাঁপছে। নাকি পুরো বিল্ডিং কাঁপছে? নাকি পৃথিবী?
আয়নায় শেষবার তাকালাম। দেখলাম হায়দার নামের একজন মানুষ। যে জানে না সে কী করতে চায়। যে জানে না সে কোথায় যাচ্ছে। যে শুধু জানে তাকে যেতে হবে।
দরজা খুললাম। বাইরে অনেক মানুষ। সবাই হাঁটছে। কেউ জানে না কোথায় যাচ্ছে। কিন্তু যাচ্ছে। আমিও যাব। কাঁপতে কাঁপতে। এটাই নিয়ম। এটাই আইন।
করিডর দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। প্রতিটি পা ফেলার সময় মনে হচ্ছে আমি একটু একটু করে উধাও হয়ে যাচ্ছি। ইন্টারভিউ রুমে পৌঁছার আগেই হয়তো আমি সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যাব।
তবু হাঁটছি। থামার উপায় নেই।
একটু ভাবনা রেখে যান