টিভির সামনে বসে খাচ্ছি। একটা নাটক চলছে। তারপর খাবার শেষ হয়ে গেল। কিন্তু মনে নেই কী খেলাম।
কী অদ্ভুত ব্যাপার!
খাবারটা মুখে দিয়েছি। চিবিয়েছি। গিলেছি। কিন্তু স্বাদ পাইনি।
হ্যাপি পাশে বসে বলল, “কেমন লাগল খাবার?”
“ভালো,” আমি বললাম। কিন্তু সত্যি কথা হলো, আমি জানি না কেমন ছিল।
আমার সমস্ত মনোযোগ ছিল টিভি স্ক্রিনে। নাটকের চরিত্রদের কথায়। তাদের আবেগে।
খাবার ছিল শুধু একটা কাজ। একটা অভ্যাস। মুখে দিও, চিবাও, গিলে ফেলো।
“আমি কি খাবারের অপমান করলাম?” আমি মনে মনে ভাবলাম।
হ্যাপি এতো কষ্ট করে রান্na করেছে। ভালোবাসা দিয়ে বানিয়েছে। আর আমি সেই খাবার খেলাম টিভির দিকে তাকিয়ে।
পরদিন আমি একটা পরীক্ষা করলাম।
খাবার নিয়ে বসলাম। কিন্তু টিভি অফ রাখলাম। শুধু খাবার। আর আমি।
প্রথম চামচ মুখে দিলাম। স্বাদটা অন্যরকম লাগল। একই খাবার, কিন্তু আরো স্বাদু।
চিবাতে চিবাতে বুঝলাম – এতে পেঁয়াজ আছে, আদা আছে, একটুখানি জিরা আছে।
এই স্বাদগুলো আমি কতদিন মিস করেছি!
আরাশ এসে বসল পাশে। “বাবা, টিভি চালাও না কেন?”
“চালাচ্ছি না।”
“কেন?”
“খাবারের স্বাদ নিতে চাই।”
আরাশ অবাক হলো। “খাবারের স্বাদ নেওয়ার জন্য টিভি বন্ধ রাখতে হয়?”
আমি থামলাম। সত্যিই তো। কী অদ্ভুত কথা!
“আরাশ, তুই কি কখনো খেয়াল করেছিস, টিভি দেখতে দেখতে খেলে আর সাধারণভাবে খেলে স্বাদ আলাদা লাগে?”
আরাশ ভাবল। “হ্যাঁ। টিভি দেখতে দেখতে খেলে মনে হয় যেন বেশি মজাদার।”
“তুই ভুল বলছিস।”
“কেন?”
“টিভি দেখতে দেখতে খেলে খাবার বেশি মজাদার লাগে না। টিভি দেখা বেশি মজাদার লাগে।”
আরাশ আরো অবাক হলো।
আমি ব্যাখ্যা করলাম। “টিভি দেখার সময় আমাদের মন খুশি থাকে। সেই খুশি আমরা ভাবি খাবারের স্বাদ। কিন্তু আসলে সেটা টিভির আনন্দ।”
“তাহলে আসল স্বাদ কী?”
“আসল স্বাদ হলো যখন তুই শুধু খাবারে মনোযোগ দিস।”
আমি আরাশকে বললাম, “চল, আমরা দুজন একসাথে টিভি বন্ধ করে খাই। দেখি কেমন লাগে।”
আরাশ রাজি হলো।
আমরা দুজনে নিরবে খেলাম। কোনো কথা বললাম না। শুধু খাবারের স্বাদ নিলাম।
দশ মিনিট পর আরাশ বলল, “বাবা, খাবার আরো ভালো লাগছে। কিন্তু সময় যাচ্ছে না।”
আমি হেসে ফেললাম। আরাশ একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছে।
টিভি দেখতে দেখতে খেলে সময় তাড়াতাড়ি কাটে। কিন্তু খাবারের স্বাদ পাওয়া যায় না।
শুধু খাবার খেলে স্বাদ বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু সময় ধীরে কাটে।
“আরাশ, আমরা কেন সময় তাড়াতাড়ি কাটাতে চাই?”
আরাশ ভাবল। “জানি না। হয়তো বিরক্তি লাগে।”
“কী বিরক্তি লাগে?”
“চুপচাপ থাকতে বিরক্তি লাগে।”
“তার মানে আমাদের সাথে থাকতে নিজেদের বিরক্তি লাগে?”
আরাশ থমকে গেল।
হ্যাপি রান্নাঘর থেকে বলল, “তোমরা কী এমন গভীর আলোচনা করছো?”
“আমরা বুঝার চেষ্টা করছি কেন টিভি দেখতে দেখতে খেলে স্বাদ আলাদা লাগে।”
হ্যাপি এসে বসল। “এটা নিয়ে এতো ভাবনা কেন?”
“কারণ আমি বুঝতে পেরেছি, আমি খাবারের সাথে অবিচার করছি।”
“কী রকম?”
“তুমি এতো ভালোবাসা দিয়ে রান্না কর। আর আমি সেই খাবার খেতে খেতে টিভি দেখি। খাবারে মনোযোগ দিই না।”
হ্যাপি আমার হাত ধরল। “হায়দার, তুমি খেলেই আমার খুশি।”
“কিন্তু আমি ঠিকমতো উপভোগ করি না।”
রাতে ঘুমানোর আগে আমি ভাবলাম – আমরা কখন থেকে খাওয়া আর বিনোদনকে একসাথে করা শুরু করলাম?
আমার ছোটবেলায় খাওয়ার সময় কথা বলা নিষেধ ছিল। “চুপচাপ খাও” – মা বলতেন।
সেই সময় খাবারের স্বাদ পেতাম।
এখন খাওয়ার সময় টিভি, ফোন, কথাবার্তা – সব চলে।
কিন্তু স্বাদ পাই না।
একটু ভাবনা রেখে যান