ব্লগ

স্ক্রিনের দাস

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

“Daily Screen Time: 8 hours 47 minutes” – এই সংখ্যাটা দেখতেই আমার মনে হল যেন নিজের উপর একটা থাপ্পড় মেরেছি। প্রায় ৯ ঘন্টা? এটা তো প্রায় একটা পূর্ণ কর্মদিবসের সমান।

আমি স্ক্রল করে দেখলাম কোন অ্যাপে কতক্ষণ কাটিয়েছি। ফেসবুক – ২ ঘন্টা ৩৫ মিনিট। ইউটিউব – ২ ঘন্টা ১২ মিনিট। ইনস্টাগ্রাম – ১ ঘন্টা ২৮ মিনিট। বাকি সময় এটা-ওটা মিলিয়ে।

প্রতিটা সংখ্যা দেখে আমার বুকে যেন ছুরি বিধে গেল। এই সময়গুলোতে আমি কী করেছি? কী শিখেছি? কী অর্জন করেছি? নাকি শুধু সময় নষ্ট করেছি?

হ্যাপি রান্নাঘর থেকে চিৎকার করে বলল, “হায়দার, আরাশের সাথে একটু খেলাধুলা কর না।” আমি বললাম, “একটু পরে।” কিন্তু ভিতরে জানি, আমি আবার ফোন স্ক্রল করব।

আরাশ এসে বলল, “বাবা, তুমি সারাদিন ফোন নিয়ে থাক। আমার সাথে কথা বল না।” এই কথাটা শুনে আমার গলায় যেন কিছু একটা আটকে গেল। আমার ছেলে কি আমাকে ফোনের দাস হিসেবে দেখে?

মনে পড়ে গেল, ছোটবেলায় বাবার সাথে কত সময় কাটাতাম। সন্ধ্যায় ছাদে বসে গল্প করতাম। বই পড়তাম। তখন কোনো ফোন ছিল না। কোনো স্ক্রিন ছিল না। শুধু মানুষে মানুষে কথা।

আর এখন? এখন আমার দিনের অর্ধেকেরও বেশি সময় কাটে একটা স্ক্রিনের সামনে। আমি কি একটা রোবট হয়ে গেছি? যার শুধু একটাই কাজ – স্ক্রল করা।

আমি চেষ্টা করলাম হিসাব করতে। একদিনে ৯ ঘন্টা স্ক্রিন টাইম মানে সপ্তাহে ৬৩ ঘন্টা। মাসে ২৭০ ঘন্টা। বছরে ৩২৮৫ ঘন্টা। এটা কি একটা জীবন?

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ের কথা হল – এই ৯ ঘন্টায় আমি কী দেখেছি? কে কী খেয়েছে, কে কোথায় গিয়েছে, কার সাথে কার ঝগড়া হয়েছে। এগুলো জানার পর আমার জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে?

হঠাৎ মনে হল, আমি যদি এই ৯ ঘন্টা ব্যবহার করতাম অন্য কাজে? একটা নতুন ভাষা শিখতে পারতাম। একটা বই লিখতে পারতাম। একটা বাগান করতে পারতাম। আরাশের সাথে আরও সময় কাটাতে পারতাম।

কিন্তু তা করিনি কেন? কারণ স্ক্রিন আমাকে একটা মিথ্যা তৃপ্তি দেয়। প্রতিটা লাইক, প্রতিটা কমেন্ট, প্রতিটা নতুন ভিডিও আমার মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ করে। আমি আসক্ত হয়ে গেছি এই কৃত্রিম আনন্দে।

আমি ভাবলাম – আমার বাবা যদি জীবিত থাকতেন, আর দেখতেন যে আমি দিনে ৯ ঘন্টা একটা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি, উনি কী বলতেন?

হ্যাপি এসে বলল, “হায়দার, কী ভাবছ এত গম্ভীর হয়ে?” আমি ফোনের স্ক্রিন টাইম দেখিয়ে বললাম, “দেখ, আমি দিনে কত সময় ফোন ব্যবহার করি।” হ্যাপি দেখে বলল, “এত বেশি? তুই কি পাগল হয়ে গেছিস?”

পাগল। হ্যাঁ, হয়তো আমি সত্যিই পাগল হয়ে গেছি। একটা ডিজিটাল পাগল। যে বুঝতেই পারে না কখন সকাল, কখন সন্ধ্যা। শুধু স্ক্রল করতেই থাকে।

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম – আগামীকাল থেকে আমি স্ক্রিন টাইম কমাবো। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নিয়েই আমার হাত অজান্তে ফোন তুলে নিল। আবার স্ক্রল করতে শুরু করলাম।

রাতে শুয়ে ভাবলাম – আমি কি আমার জীবনটা বিনিময় করে দিচ্ছি কিছু ডিজিটাল কনটেন্টের জন্য? আমার সময়, আমার মানসিকতা, আমার পারিবারিক সম্পর্ক – সব কিছু ত্যাগ করে দিচ্ছি এই স্ক্রিনের জন্য?

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ের কথা হল – আমি জানি এই সব কিছু, কিন্তু তবু থামতে পারি না। আমি স্ক্রিনের দাস হয়ে গেছি।

এই দাসত্ব থেকে মুক্তি কি আছে?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

ব্লগ

মিথ্যা

নভেম্বর ২০২৫ · 11 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *