ব্লগ

স্ক্রিনের ওপারে মানুষ

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

কালকে মৃদুলের কল এসেছিল কানাডা থেকে। ভিডিও কল। স্ক্রিনে তার মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম, কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছিল সে আসলে নেই।

“কেমন আছিস?” সে জিজ্ঞেস করল। আমি বললাম, “ভালো।” কিন্তু আমার কণ্ঠে যে কম্পনটা ছিল, সেটা কি সে শুনতে পেল?

ভিডিও কলে আমরা মুখ দেখি। কিন্তু চোখ দেখি না। কারণ ক্যামেরা আর চোখ এক জায়গায় নয়। যখন আমি তার চোখের দিকে তাকাই, আমি আসলে স্ক্রিনের দিকে তাকাই। আর যখন আমি ক্যামেরার দিকে তাকাই, তখন তার মনে হয় আমি তার দিকে তাকাচ্ছি না।

এই ছোট্ট ভুলটাই কি আমাদের আলাদা করে দেয়?

সামনাসামনি বসলে আমরা একসাথে শ্বাস নিই। একই বাতাস। একই তাপমাত্রা। একই আলো। কিন্তু ভিডিও কলে মৃদুল কানাডার শীতে, আমি ঢাকার গরমে। তার সকাল, আমার রাত। তার শীত, আমার গ্রীষ্ম।

আমরা একই সময়ে কথা বলছি, কিন্তু একই সময়ে বাস করছি না।

হ্যাপি কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখল আমি ফোনে কথা বলছি। সে কিছু বলল না, কিন্তু আমি বুঝলাম সে জানে আমি কার সাথে কথা বলছি। এটাই তো আসল উপস্থিতি – বুঝে যাওয়া।

মৃদুল স্ক্রিনে ছিল, কিন্তু উপস্থিত ছিল না। হ্যাপি স্ক্রিনে ছিল না, কিন্তু উপস্থিত ছিল।

তাহলে উপস্থিতি কি দেখার বিষয় নাকি অনুভবের?

কথা বলার সময় মৃদুল একবার তার ঘরের জানালার দিকে তাকাল। আমি বুঝলাম না সে আমার কথা শুনছে নাকি বাইরের কিছু দেখছে। সামনাসামনি হলে আমি তার মনোযোগ অনুভব করতে পারতাম। ভিডিও কলে সেটা হারিয়ে যায়।

আমরা কি শুধু একে অপরের ছবি দেখি? নাকি একে অপরকে দেখি?

ছবি স্থির। মানুষ গতিশীল। ভিডিও কল আমাদের ছবিতে পরিণত করে।

সবচেয়ে বড় কথা – ভিডিও কলে আমরা নিজেদের দেখি। স্ক্রিনের কোণে ছোট্ট একটা বাক্সে আমার মুখ। কথা বলার সময় আমি নিজেকে দেখছি। আমার চেহারা ঠিক আছে কি না, আমার অভিব্যক্তি কেমন লাগছে।

এই আত্মসচেতনতা কি কথোপকথনের স্বাভাবিকতা নষ্ট করে?

সামনাসামনি কথা বলার সময় আমি ভুলে যাই আমি কেমন দেখাচ্ছি। শুধু মনোযোগ দিই অন্যজনকে। ভিডিও কলে আমি একসাথে দুটো কাজ করি – নিজেকে দেখি আর অন্যকে শুনি।

তাহলে কি আমরা আসলে একে অপরের সাথে কথা বলি, নাকি নিজেদের সাথে?

মৃদুল বলল তার নতুন চাকরির কথা। আমি খুশি হওয়ার অভিনয় করলাম। কিন্তু সেই অভিনয়টা কি সে ধরতে পারল? সামনাসামনি হলে আমার চোখ দেখেই সে বুঝত আমার মনের অবস্থা।

ভিডিও কলে আমরা শব্দ শুনি, ছবি দেখি। কিন্তু অনুভূতি বিনিময় করি না।

অনুভূতি হয়তো স্ক্রিনে ধরা যায় না। সেটা বাতাসে থাকে। শ্বাসে থাকে। নীরবতায় থাকে।

ভিডিও কলে নীরবতা অস্বস্তিকর। সামনাসামনি নীরবতা আরামদায়ক।

এই পার্থক্যটাই কি সব বলে দেয়?

কল শেষ করার পর আমি ভাবলাম – আমি কি মৃদুলের সাথে কথা বলেছি, নাকি তার একটা ছবির সাথে?

হ্যাপি পাশে এসে বসল। কিছু বলল না। শুধু আমার কাঁধে হাত রাখল। এই স্পর্শটুকুই বুঝিয়ে দিল – আসল উপস্থিতি কাকে বলে।

স্ক্রিনে মানুষ আছে। কিন্তু মানুষ নেই।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *