আজ আমার শেষ দিন। পঁয়ষট্টি বছর বয়স। অবসরের দিন। ডেস্কের সব জিনিস বক্সে ভরছি। পেন, পেনসিল, ফটোফ্রেম। এই টেবিলে বিশ বছর কাটিয়েছি। আজ এটা আর আমার না।
অদ্ভুত লাগছে। কিন্তু দুঃখ নয়। মুক্তি।
হাতে একটা ছবি। অফিসের পিকনিকের। সবাই হাসছে। আমিও হাসছি। কিন্তু চোখ দেখলে বোঝা যায় হাসি নকল। কত বছর এই নকল হাসি হেসেছি।
জুনিয়র রহমান এসে বলল, “স্যার, আপনাকে মিস করব।” আমি বললাম, “তুমিও একদিন বুঝবে।” সে বুঝল না। কীভাবে বুঝবে? আমিও তো তার বয়সে বুঝতাম না।
লিফটে নেমে এসে রিসেপশনের দিকে তাকালাম। রিতা বলল, “স্যার, হ্যাপি রিটায়ারমেন্ট।” হ্যাপি রিটায়ারমেন্ট। হ্যাঁ, এই প্রথম আসলেই হ্যাপি হতে পারব।
গেটে বেরিয়ে পেছনে ফিরে তাকালাম। এই বিল্ডিং। এই অফিস। বিশ বছর এখানে এসেছি। প্রতিদিন। রোদে, বৃষ্টিতে, অসুখে। কিন্তু কেন? কীসের জন্য?
পয়সার জন্য? হ্যাঁ। সংসারের জন্য? হ্যাঁ। সামাজিক মর্যাদার জন্য? হ্যাঁ। কিন্তু নিজের জন্য? না।
বাস স্টপে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালাম। কত সুন্দর মেঘ। কবে শেষ মেঘ দেখেছিলাম? অফিসের জানালা থেকে আকাশ দেখা যেত। কিন্তু দেখার সময় কই?
বাড়ি ফিরে দেখি বাগানে একটা গোলাপ ফুটেছে। লাল গোলাপ। এত সুন্দর। কিন্তু কয়দিন আগে ফুটেছে জানি না। অফিসের কাজে এত ব্যস্ত থাকতাম যে ফুলও দেখতাম না।
রাতে খাওয়ার পর বারান্দায় বসলাম। নীরবতা। কত দিন পর এই নীরবতা। অফিসে সারাক্ষণ গোলমাল। ফোনের রিং। মিটিং। ডেডলাইন। আজ কোনো ডেডলাইন নেই।
একটা প্রশ্ন মনে এল। এই বিশ বছরে আমি কী অর্জন করেছি? একটা বাড়ি। দুটো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। কিছু জমি। কিন্তু নিজের কাছে কী অর্জন করেছি?
আমি কী হতে চেয়েছিলাম ছোটবেলায়? মনে পড়ে না। কোথাও হারিয়ে গেছে সেই স্বপ্নগুলো। অফিসের ফাইলের নিচে চাপা পড়েছে।
আমি কি সুখী ছিলাম? কখনো ভাবিনি। সুখ-দুঃখ ভাবার সময় কই? শুধু দৌড়েছি। কিসের পেছনে দৌড়েছি জানি না। কিন্তু দৌড়েছি।
পাশের বাড়ির রহিম আঙ্কেল গত মাসে মারা গেলেন। সারাজীবন চাকরি করেছেন। রিটায়ারমেনটের দুই মাস পর মৃত্যু। কী কাজে লাগল তার জমানো টাকা-পয়সা?
আমি কতটা বেঁচেছি? নাকি শুধু টিকে ছিলাম?
এই প্রশ্নের উত্তর ভয়ানক। আমি বেঁচে ছিলাম ভবিষ্যতের জন্য। সন্তানের জন্য। পরিবারের জন্য। কিন্তু নিজের জন্য? বর্তমান মুহূর্তের জন্য? না।
আগামীকাল থেকে নতুন জীবন। এবার কি নিজের জন্য বাঁচব? বাগানে ফুলের যত্ন নেব। বই পড়ব। গান শুনব। যা ভালো লাগে সেই কাজ করব।
কিন্তু এত দেরিতে? পঁয়ষট্টি বছর বয়সে? জীবনের শেষ বিকেলে এসে?
হয়তো দেরি করেই উপলব্ধি আসে। জীবনের আসল অর্থ।
অর্থ হচ্ছে—প্রতিটি মুহূর্তকে অনুভব করা। প্রতিটি শ্বাসকে ধন্যবাদ দেওয়া। নিজেকে ভালোবাসা।
তাহলে কি আমার জীবন বৃথা গেল? না। এই উপলব্ধিটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
বাকি যে কয়টা বছর বাঁচব, সেই বছরগুলো হবে আমার। সত্যিকারের আমার।
একটু ভাবনা রেখে যান