ব্লগ

শেষ খেলা

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে আরাশকে দেখলাম তার পুরনো লেগো সেট গুছিয়ে রাখছে। সেই লেগো যা দিয়ে সে কত স্বপ্নের শহর বানিয়েছে। “কী করছিস?”

“বাবা, এগুলো রেখে দিচ্ছি। আর তেমন ইচ্ছা করে না।”

আমার ভিতরে একটা অ্যাপ খুলে গেল যার নাম “সময়ের নিষ্ঠুরতা ভার্সন ক্রমবর্ধমান”।

“কেন? তুই তো এই লেগো দিয়ে কত মজা করতিস।”

আরাশ থেমে বলল, “বাবা, এখন মনে হয় আসল জিনিস বানানোর সময় এসেছে। খেলার নয়।”

আমি অবাক হলাম। কখন এই ছেলেটা এত বড় হয়ে গেল? কখন তার মধ্যে এই দায়িত্ববোধ এলো?

অফিসে একটা তরুণ সহকর্মীর সাথে কথা বলছিলাম। “কখন বুঝলে তুমি বড় হয়ে গেছো?”

“স্যার, যেদিন বাবা আমার কাছে টাকা ধার চাইলেন।”

“তার মানে?”

“তার মানে সেদিন বুঝলাম আমি আর সন্তান নই। আমি পরিবারের একটা স্তম্ভ।”

রাতে হ্যাপির সাথে কথা বলছিলাম। “তোর মনে আছে তুই কখন বুঝেছিলি তুই আর বাচ্চা নেই?”

“হ্যাঁ। যেদিন আমার মা অসুস্থ হলেন, আর আমি তার পাশে বসে রইলাম। সারারাত তার হাত ধরে। সেদিন বুঝলাম আমি আর যত্ন নেওয়ার বয়স নেই। যত্ন দেওয়ার বয়স।”

আমার মনে পড়ল আমার বাবার মৃত্যুর দিনটা। সেদিনই আমি বুঝেছিলাম খেলার সময় শেষ। এখন থেকে আমাকে হ্যাপি আর আরাশের দায়িত্ব নিতে হবে।

কিন্তু সেই দিনটা কি সত্যিই একটা নির্দিষ্ট দিন? নাকি একটা ধীর প্রক্রিয়া?

আরাশকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুই কি মিস করিস তোর খেলনা?”

“একটু। কিন্তু এখন অন্যরকম মজা লাগে।”

“কেমন?”

“আমি যখন আমার আর্ট দিয়ে কাউকে খুশি করি, সেটা লেগো বানানোর চেয়ে বেশি ভালো লাগে।”

আমি বুঝলাম। দায়িত্ব নেওয়া মানে খুশি হারানো নয়। অন্যরকম খুশি পাওয়া।

রহিম চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম, “চাচা, আপনি কি মনে করেন বড় হওয়া একটা ক্ষতি?”

“না বাবা। বরং লাভ। কারণ তখন তুমি অন্যদের জন্য কিছু করতে পারো।”

“কিন্তু খেলার আনন্দ তো চলে যায়।”

চাচা হেসে বলললেন, “কে বলেছে? খেলা বদলায়। আগে তুমি নিজের জন্য খেলতে। এখন অন্যদের খুশি করার খেলা খেলো।”

নামাজ পড়ে ভাবছিলাম। আল্লাহ আমাদের দায়িত্ব দিয়েছেন তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে। এই দায়িত্ব কি বোঝা নাকি সম্মান?

আরাশকে দেখছি সে তার পুরনো খেলনা ছোট বাচ্চাদের দিয়ে দিচ্ছে। তাদের খুশি দেখে তার মুখেও হাসি।

“কেমন লাগছে?”

“বাবা, আমার মনে হচ্ছে আমি আরও বড় একটা খেলা খেলছি।”

“কেমন খেলা?”

“অন্যদের খুশি করার খেলা। এটা অনেক কঠিন, কিন্তু অনেক মজার।”

আমি বুঝলাম। খেলনা ছেড়ে দায়িত্ব নেওয়া একটা loss নয়, একটা upgrade।

শৈশবে আমরা কল্পনার জগত বানাই। যৌবনে আমরা বাস্তব জগত বানাই।

কিন্তু সবচেয়ে বড় খেলা হলো পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটা ভালো পৃথিবী তৈরি করা। সেই খেলায় আমরা সবাই player।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *