ব্লগ

নির্দোষতার শেষ অভিনয়

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

একটি একাঙ্ক নাটক


চরিত্র পরিচিতি


দৃশ্য ১: শৈশবের রাজ্য

(মঞ্চে উজ্জ্বল আলো। ছোট হায়দার খেলনা নিয়ে খেলছে)

ছোট হায়দার: (খেলনা গাড়ি চালাতে চালাতে) ব্রুম ব্রুম! আমি পুলিশ! সব খারাপ মানুষদের ধরে জেলে দেব!

(হায়দার মঞ্চের এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখছে)

হায়দার: (দর্শকদের দিকে তাকিয়ে) দেখুন ওকে। কত সহজ ছিল তখন। পুলিশ মানে ভালো মানুষ। খারাপ মানুষ মানে চোর-ডাকাত। কালো আর সাদা। কোনো ধূসর রং নেই।

ছোট হায়দার: (আনন্দে) আমি বড় হয়ে সবাইকে রক্ষা করব! কেউ কাঁদবে না!

(আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়)

কণ্ঠস্বর: সময় একটি নিষ্ঠুর শিল্পী। সে রং মিশিয়ে দেয় যেখানে আগে ছিল স্বচ্ছতা।


দৃশ্য ২: প্রথম ফাটল

(আলো আবার জ্বলে। কিশোর হায়দার বই নিয়ে বসে আছে)

কিশোর হায়দার: (বিভ্রান্ত) এটা কী? ইতিহাস বইয়ে লেখা স্বাধীনতা সংগ্রামীরা বীর। কিন্তু কাকা বলেন অনেকেই ছিল সুবিধাবাদী।

(হায়দার কাছে এসে দাঁড়ায়)

হায়দার: প্রথম ধাক্কা। যখন জানলাম বিশ্বাস আর বাস্তবতা এক নয়।

কিশোর হায়দার: (হতাশ) তাহলে আমি কীভাবে জানব কে ভালো, কে খারাপ?

হায়দার: (দীর্ঘশ্বাস) সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো খুঁজছি।

(আলো আবার ম্লান)

কণ্ঠস্বর: প্রশ্ন হলো নির্দোষতার প্রথম শত্রু। উত্তর হলো দ্বিতীয়।


দৃশ্য ৩: যৌবনের আঘাত

(যুবক হায়দার অফিসের পোশাকে মঞ্চে এসে দাঁড়ায়)

যুবক হায়দার: (ক্রোধে) আমি সৎভাবে কাজ করেছি। রিপোর্টে সত্য লিখেছি। আর বস আমাকে বলছে “তুমি naive।”

হায়দার: (কাছে এসে) সেদিন জানলাম সততা একটি luxury। যেটা সবাই afford করতে পারে না।

যুবক হায়দার: (ভেঙে পড়ে) তাহলে আমি কী করব? মিথ্যা বলব? দুর্নীতি করব?

হায়দার: তুমি একটা মধ্যপথ খুঁজবে। যেটাকে আমরা বলি “বাস্তববাদী” হওয়া।

(যুবক হায়দার ধীরে ধীরে মঞ্চ থেকে সরে যায়)

কণ্ঠস্বর: নির্দোষতা মরে যায় না। সে শুধু ভূগর্ভে চলে যায়। লুকিয়ে থাকে।


দৃশ্য ৪: বর্তমান – আয়নার সামনে

(হায়দার একা মঞ্চে। তার সামনে একটি অদৃশ্য আয়না)

হায়দার: (আয়নায় তাকিয়ে) আমি এখন জানি পৃথিবী জটিল। মানুষ ভালো-মন্দের মিশ্রণ। ন্যায়-অন্যায়ের সীমানা অস্পষ্ট।

(থামে)

কিন্তু এই জানাটা কি আমাকে বুদ্ধিমান করেছে নাকি হৃদয়হীন?

(আরাশ মঞ্চে এসে দাঁড়ায়)

আরাশ: বাবা, আমার বন্ধু বলেছে সব মানুষই স্বার্থপর। এটা কি সত্যি?

হায়দার: (দ্বিধায়) আরাশ… (থামে)

(দর্শকদের দিকে তাকিয়ে)

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমি আটকে যাই। আমি কি তাকে সেই সহজ উত্তর দেব যা আমি ৭ বছর বয়সে বিশ্বাস করতাম? নাকি জটিল সত্য বলব যা আমি ৩৯ বছরে জানি?

আরাশ: বাবা?

হায়দার: (দীর্ঘক্ষণ পর) তুই নিজে দেখে বুঝবি। আমি তোর নির্দোষতা কেড়ে নেব না।


দৃশ্য ৫: নির্দোষতার প্রত্যাবর্তন

(সব চরিত্র মঞ্চে ফিরে আসে। বিভিন্ন বয়সের হায়দাররা একসাথে)

ছোট হায়দার: আমি হারিয়ে গেছি?

কিশোর হায়দার: আমাদের প্রশ্নগুলো কি ভুল ছিল?

যুবক হায়দার: আমাদের সংগ্রাম কি অর্থহীন?

হায়দার: (সবার দিকে তাকিয়ে) না। তোমরা হারিয়ে যাওনি। তোমরা আমার ভেতরে আছো।

(আরাশের দিকে ফিরে)

আরাশ, নির্দোষতা হারানো মানে বিশ্বাস হারানো নয়। মানে… বিশ্বাস করার জন্য আরও বেশি সাহসের প্রয়োজন।

আরাশ: মানে?

হায়দার: মানে, ৭ বছর বয়সে আমি ভাবতাম পৃথিবী সুন্দর কারণ আমি কিছু জানতাম না। এখন আমি জানি পৃথিবী কুৎসিত, কিন্তু তবুও চেষ্টা করি সুন্দর করতে।

(থামে)

এটাই হয়তো পরিপক্ক নির্দোষতা।

কণ্ঠস্বর: নির্দোষতা একবার হারিয়ে গেলে ফিরে আসে না। কিন্তু তার জায়গায় আসে কিছু আরও মূল্যবান – সচেতন ভালোবাসা।


শেষ দৃশ্য: নীরবতা

(সব চরিত্র নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। ধীরে ধীরে আলো ম্লান হয়ে আসে)

হায়দার: (দর্শকদের দিকে তাকিয়ে) নির্দোষতা হারানোর বেদনা হলো – আমরা জানি পৃথিবী কেমন, কিন্তু মনে থাকে পৃথিবী কেমন হওয়া উচিত ছিল।

(দীর্ঘ নীরবতা)

কিন্তু এই বেদনাটাই হয়তো আমাদের মানুষ বানায়।

(সম্পূর্ণ অন্ধকার)

কণ্ঠস্বর: (ধীরে ধীরে) নির্দোষতা মরে না। সে রূপান্তরিত হয়। শৈশবের বিশ্বাস হয়ে ওঠে প্রাপ্তবয়স্কের আশা।

(পর্দা নামে)


নাট্য সমাপ্ত

নির্দেশনা: এই নাটকটি একটি খালি মঞ্চে, সর্বনিম্ন আলো ও সাজসজ্জায় মঞ্চস্থ করা যেতে পারে। মূল জোর থাকবে সংলাপ ও অভিনয়ে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *