ব্লগ

স্বাধীনতার ভ্রম

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। আমি চা খেতে খেতে হঠাৎ ভাবলাম—এই চা খাওয়াটা কি আমার সিদ্ধান্ত? নাকি আমার মস্তিষ্কের কোনো রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফলাফল?

আমি চা খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি—এটা মনে হচ্ছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তটা এলো কোথা থেকে? আমার অতীত অভিজ্ঞতা থেকে। আমার মায়ের অভ্যাস থেকে। আমার জিনগত প্রবণতা থেকে।

তাহলে আমি কি সত্যিই স্বাধীনভাবে চা খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি? নাকি বিলিয়ন বছরের বিবর্তন আর আমার জীবনের উনচল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতা মিলে এই সিদ্ধান্তটা তৈরি করেছে?

হ্যাপি এসে বলল, “কী ভাবছো?” আমি বললাম, “ভাবছি—আমি কি স্বাধীন?”

“কেমন স্বাধীন?”

“আমি যে সিদ্ধান্তগুলো নিই, সেগুলো কি আমার নিজের? নাকি আমার মস্তিষ্কের কোনো প্রোগ্রামিং?”

হ্যাপি হেসে বলল, “তুমি আবার শুরু করেছো।” কিন্তু আমি থামতে পারলাম না।

আমি কেন হ্যাপিকে ভালোবেসেছি? এটা কি আমার পছন্দ ছিল? নাকি আমার হরমোন, আমার মনস্তত্ত্ব, আমার সামাজিক প্রভাব—এসব মিলে এই ভালোবাসা তৈরি হয়েছে?

যদি আমি অন্য পরিবারে জন্মাতাম, অন্য সমাজে বড় হতাম, তাহলে কি আমি একই সিদ্ধান্ত নিতাম?

আরাশ এসে বলল, “বাবা, আজ স্কুলে যাবো?” আমি বললাম, “তুমি কি যেতে চাও?” সে বলল, “জানি না। তুমি বলো।”

আমি ভাবলাম—আরাশ এখানে একটা পছন্দের মুখোমুখি। সে স্কুলে যাবে নাকি যাবে না। কিন্তু তার এই পছন্দ কি সত্যিই স্বাধীন?

তার বয়স, তার মেজাজ, তার শারীরিক অবস্থা, আমার প্রতিক্রিয়া—এসব কি তার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে না?

আমি বললাম, “তুমি নিজেই ঠিক করো।” কিন্তু মনে মনে ভাবলাম—সে আসলেই কি নিজে ঠিক করবে?

দুপুরে জামিউরের সাথে এই নিয়ে কথা হলো। জামিউর বলল, “আরে ভাই, আমি তো আমার সিদ্ধান্ত নিই। কেউ আমাকে জোর করে না।”

“কিন্তু তোমার সিদ্ধান্ত কোথা থেকে আসে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“আমার মাথা থেকে।”

“কিন্তু তোমার মাথায় যে চিন্তা আসে, সেটা কোথা থেকে?”

জামিউর চুপ হয়ে গেল।

আমি আরো বললাম, “তুমি ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছো। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পেছনে আছে তোমার পারিবারিক অবস্থা, তোমার ব্যক্তিত্ব, তোমার সুযোগ। এগুলো কি তুমি বেছে নিয়েছো?”

“না,” জামিউর স্বীকার করল। “কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আমি কী করবো, সেটা তো আমার পছন্দ।”

“কিন্তু তোমার পছন্দটাও তো তোমার অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আসে।”

আমরা দুজনেই চুপ হয়ে গেলাম।

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে আমি ভাবলাম—আমি এই মুহূর্তে যে প্রশ্নগুলো করছি, এগুলোও কি আমার স্বাধীন চিন্তা? নাকি আমার মস্তিষ্কের গঠন, আমার শিক্ষা, আমার পরিবেশ—এসব মিলে এই প্রশ্নগুলো তৈরি হয়েছে?

যদি আমি অন্য কোনো মানুষ হতাম, তাহলে কি আমি এই প্রশ্নগুলো করতাম?

কিন্তু তাহলে দায়িত্ব কার? আমি যদি খারাপ কিছু করি, সেটার জন্য আমি দায়ী? নাকি আমার পরিস্থিতি দায়ী?

আমি যদি ভালো কিছু করি, সেটার কৃতিত্ব আমার? নাকি আমার ভাগ্যের?

রাতে শুয়ে আরো ভাবলাম। আমি কি আসলেই আমার জীবনের নিয়ন্ত্রণে? নাকি আমি একটা জটিল যন্ত্রের অংশ, যেটা ভাবে সে স্বাধীন?

কিন্তু তারপর একটা অন্য চিন্তা এলো। যদি আমি সত্যিই স্বাধীন না হই, তাহলে এই প্রশ্ন করাটাও অর্থহীন। কারণ আমি এই প্রশ্ন করতে বাধ্য।

আর যদি আমি স্বাধীন হই, তাহলে আমি এই স্বাধীনতা ব্যবহার করে কী করবো?

আমার মনে হলো—হয়তো এই প্রশ্নটা ভুল। প্রশ্নটা হওয়া উচিত—আমি স্বাধীন কি না তা নিয়ে চিন্তা করার চেয়ে আমি কী করবো তা নিয়ে চিন্তা করা কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়?

আমি স্বাধীন হোক বা না হোক, আমাকে তো সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। আমাকে তো বাঁচতেই হবে।

তাহলে আমি যা অনুভব করি তাই কি সত্য নয়? আমার মনে হয় আমি পছন্দ করি। আমার মনে হয় আমি সিদ্ধান্ত নিই।

এই অনুভূতিটাই কি আমার জন্য যথেষ্ট নয়?

আমি ঠিক করলাম—আমি স্বাধীন কি না, সেটা নিয়ে ভাবার চেয়ে আমি দায়িত্বশীল হতে চেষ্টা করবো। আমার পরিবার, আমার সমাজ, আমার নিজের জন্য ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করবো।

কারণ শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো—আমি কী করি। আমার উদ্দেশ্য কেমন। আমার প্রভাব কেমন।

আর এই দায়িত্ববোধটাই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *