ব্লগ

শাসনের নামে শয়তানি

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গতকাল রাতে পাশের বাড়ি থেকে চিৎকারের আওয়াজ এলো। রশিদ ভাইয়ের বউ কাঁদছে। আবার মারধর। এটা প্রায়ই হয়। সকালে দেখি ভাবীর হাতে ব্যান্ডেজ।

জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে ভাবী?”

চোখ নামিয়ে বলল, “পড়ে গিয়েছি।”

আমি জানি পড়ে যায়নি। রশিদ ভাই মেরেছে। কিন্তু কেন? সন্ধ্যায় রশিদ ভাইয়ের সাথে দেখা। হেসে বলল, “হায়দার ভাই, মেয়েমানুষদের মাঝে মাঝে শাসন করতে হয়। না হলে মাথায় চড়ে বসে।”

“কী করেছিল?” জিজ্ঞেস করলাম।

“বাবার বাড়ি থেকে দেরি করে ফিরেছে। আর রাতে খাবার ঠিকমতো রান্না হয়নি।”

আমার বুকে রাগ চাপল। এইগুলোর জন্য মারধর? “এটা তো শাসন না, নির্যাতন।”

রশিদ ভাই কুরআনের আয়াত দিয়ে জবাব দিল, “আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা তাদের মৃদু প্রহার কর।'”

আমি হতবাক। কুরআনের আয়াতকে এভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে?

বাসায় ফিরে রাতে ইন্টারনেটে খোঁজ নিলাম। দেখলাম যে আয়াতটির (নিসা ৪:৩৪) সঠিক ব্যাখ্যা সম্পর্কে বিস্তর আলোচনা আছে।

অনেক স্কলার বলেছেন, এই আয়াত নির্যাতনের অনুমতি দেয় না। এখানে “ওয়াদরিবুহুন্না” শব্দটির অর্থ নিয়ে মতভেদ আছে। অনেকে বলেছেন এর অর্থ “আলাদা হয়ে যাও” বা “দূরত্ব তৈরি করো।”

এমনকি যারা “মৃদু প্রহার” এর অনুবাদ গ্রহণ করেন, তারাও বলেছেন এটি এমন হবে যা কোনো ব্যথা বা দাগ সৃষ্টি করে না। রসুল (সা) বলেছিলেন, “তোমরা কখনো মুখে মারো না।” উনি আরো বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো তারা যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে ভালো ব্যবহার করে।”

হ্যাপিকে বললাম এসব কথা। হ্যাপি বলল, “যারা স্ত্রীকে মারে, তারা আসলে নিজেদের হীনমন্যতা ঢাকার চেষ্টা করে।”

আরাশ শুনে বলল, “আব্বু, তুমি কি কখনো আম্মুকে মেরেছো?”

“কখনো না। মারব কেন? আম্মু আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ।”

“তাহলে রশিদ কাকা কেন মারে?”

আমি বুঝিয়ে বললাম, “কিছু মানুষ ভাবে নিজেরা খুব বড়। স্ত্রীকে মনে করে নিজেদের সম্পত্তি। কিন্তু ইসলামে স্ত্রী-স্বামী একে অপরের পার্টনার।”

আমি ভাবি, আল্লাহ যদি চাইতেন স্ত্রীদের মারধর করা হোক, তাহলে রসুল (সা) কেন কখনো তার স্ত্রীদের হাত তুলেননি? উনি কেন বলেছিলেন, “তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে ভালো, সে তার পরিবারের কাছে সবচেয়ে ভালো।”

মনে পড়ে আইশা (রা) এর কথা। উনি বলেছিলেন, “রসুল (সা) কখনো কোনো স্ত্রী বা সেবকের গায়ে হাত তোলেননি।”

আরো মনে পড়ে উমর (রা) এর ঘটনা। যখন উনি স্ত্রীর সাথে জোরে কথা বলেছিলেন, তখন রসুল (সা) অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন।

তাহলে কেন আজকে পুরুষরা ধর্মের দোহাই দিয়ে স্ত্রীদের উপর নির্যাতন করে? এটা কি ইসলাম, নাকি পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা?

বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবি। আমার হ্যাপি আমার সঙ্গী, আমার সহায়ক। আমি কিভাবে তাকে মারব? যে আমার জন্য রাতদিন কাজ করে, সংসার সামলায়, আরাশকে বড় করে?

আমার বিশ্বাস, যে পুরুষ স্ত্রীকে মারে, সে আসলে নিজেই দুর্বল। শক্তিশালী পুরুষ ভালোবাসা আর সম্মান দিয়ে পরিবার চালায়।

আল্লাহর কাছে দোয়া করি – হে আল্লাহ, যারা তোমার নামে স্ত্রীদের উপর অত্যাচার করে, তাদের হেদায়েত দাও। আর যে নারীরা কষ্ট পাচ্ছে, তাদের রক্ষা করো।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *