গতকাল বাসে উঠে দেখি সবাই ফোনে ব্যস্ত। আমিও অভ্যাসবশত ফোন বের করলাম। তারপর ভাবলাম – আমি কি নিজে থেকে ফোন দেখতে চেয়েছিলাম, নাকি অন্যদের দেখে প্রভাবিত হয়েছি? আমার এই কাজ কি আমার সিদ্ধান্ত, নাকি সামাজিক চাপের ফল?
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দেখি একজন ভিক্ষুক বসে আছে। আমি তাকে টাকা দিলাম। পাশের লোকটাও দিল। তার পরের জনও। আমি কি প্রভাব বিস্তার করেছিলাম, নাকি আমরা সবাই একে অপরকে প্রভাবিত করেছিলাম? নাকি সেই ভিক্ষুক তার উপস্থিতি দিয়ে আমাদের সবাইকে প্রভাবিত করেছিল?
ট্রেনে যাওয়ার সময় একজন বৃদ্ধ উঠলেন। আমি উঠে দাঁড়িয়ে সিট দিলাম। তার পর দেখি আরো কয়েকজন তরুণ উঠে দাঁড়াল। আমার কাজ কি তাদের অনুপ্রাণিত করেছিল? নাকি তারা আগে থেকেই এই কাজ করার মানসিকতা রাখত, শুধু একটা উদাহরণের অপেক্ষায় ছিল?
মার্কেটে গিয়ে দেখি একজন দোকানদার অন্য ক্রেতার সাথে খারাপ ব্যবহার করছে। আমার পালা এলে আমিও একটু কড়া ভাষায় কথা বললাম। তার ব্যবহার কি আমার আচরণকে প্রভাবিত করেছিল? নাকি আমি তাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য সচেতনভাবে সেই ভাষা বেছে নিয়েছিলাম?
রেস্তোরাঁয় বসে দেখি পাশের টেবিলের লোকেরা জোরে কথা বলছে। আমিও অজান্তেই আমার কণ্ঠস্বর উঁচু করলাম। তাদের শব্দ কি আমার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করেছিল? নাকি আমি পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলাম?
মসজিদে গিয়ে দেখি সবাই খুব গভীর মনোযোগে নামাজ পড়ছে। আমার নামাজও সেদিন বেশি একাগ্র হয়েছিল। সেই পরিবেশ কি আমার আধ্যাত্মিকতা বাড়িয়েছিল? নাকি আমি অন্যদের অনুকরণ করেছিলাম?
হাসপাতালের লাইনে দাঁড়িয়ে দেখি সবাই নীরব, গম্ভীর। আমিও চুপ করে রইলাম। সেই স্থানের গাম্ভীর্য কি আমার আচরণ নির্ধারণ করেছিল? নাকি আমি সেই পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করেছিলাম?
পার্কে সন্ধ্যায় হাঁটতে গিয়ে দেখি একজন তরুণ পরিবেশ নষ্ট করে কাগজ ফেলল। আমি তাকে বললাম। সে লজ্জিত হয়ে কাগজটা তুলে নিল। আমার কথা কি তার আচরণ পরিবর্তন করেছিল? নাকি তার ভেতরে আগে থেকেই বিবেক ছিল, শুধু একটা নাড়া দেওয়ার প্রয়োজন ছিল?
চায়ের দোকানে বসে শুনি একটা রাজনৈতিক আলোচনা। আমিও মতামত দিলাম। তার পর দেখি আলোচনার গতিপথ বদলে গেল। আমার কথা কি আলোচনার দিক পরিবর্তন করেছিল? নাকি আমি আলোচনার স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছিলাম?
আমার মনে হয়, প্রভাব বিস্তার করা আর প্রভাবিত হওয়া – এই দুটো একসাথে ঘটে। আমরা একটা জটিল নেটওয়ার্কের অংশ যেখানে সবাই একে অপরকে প্রভাবিত করে।
রাস্তায় যে ট্রাফিক জ্যাম হয়, সেখানে কে দায়ী? একটা গাড়ি? নাকি সব গাড়ি মিলে? প্রতিটা গাড়ি জ্যামের কারণ, আবার প্রতিটা গাড়ি জ্যামের শিকার।
বাজারে যে দাম বাড়ে, সেটা কি একজন ব্যবসায়ীর সিদ্ধান্ত? নাকি সামাজিক একটা প্রক্রিয়া যেখানে ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই অংশীদার?
যে ফ্যাশন ট্রেন্ড চালু হয়, সেটা কি কোনো একজনের সৃষ্টি? নাকি সমাজের একটা সমষ্টিগত পছন্দ?
আমি যখন ভিক্ষুকের টাকা দিই, আমি হয়তো ভাবি আমি দয়া দেখাচ্ছি। কিন্তু সেই ভিক্ষুক তার অসহায়ত্ব দিয়ে আমার বিবেক জাগিয়েছে। তাহলে কে কাকে প্রভাবিত করেছে?
যখন আমি কাউকে শিষ্টাচার শেখাই, আমি ভাবি আমি তাকে ভালো করছি। কিন্তু সেই কাজ করতে গিয়ে আমার নিজের আচরণও উন্নত হয়। তাহলে কে কার শিক্ষক?
আমার মনে হয়, আমরা সবাই একসাথে একটা সামাজিক মন তৈরি করি। যেখানে আমার চিন্তা অন্যের মধ্যে প্রবাহিত হয়, অন্যের চিন্তা আমার মধ্যে ঢুকে পড়ে। আমি কখনো সম্পূর্ণ স্বাধীন নই, আবার কখনো সম্পূর্ণ পরাধীনও নই।
হয়তো প্রশ্নটাই ভুল। প্রভাব বিস্তার করা নাকি প্রভাবিত হওয়া – এই দুটো আলাদা কিছু নয়। এটা একটা ক্রমাগত আদান-প্রদান, একটা নিরন্তর কথোপকথন।
আমি হাঁটি, তাই রাস্তা তৈরি হয়। রাস্তা আছে, তাই আমি হাঁটি। কে কার কারণ?
আমি কথা বলি, তাই ভাষা বেঁচে থাকে। ভাষা আছে, তাই আমি কথা বলতে পারি। কে কাকে সৃষ্টি করে?
এই লেখাটা লিখতে লিখতে আমার মনে হচ্ছে, আমি একটা বিশাল সমুদ্রের একটা ঢেউ। আমি সমুদ্রকে নাড়াই, সমুদ্র আমাকে নাড়ায়। আমি পানি, আমি তরঙ্গ। দুটোই একসাথে।
হয়তো এই বোঝাপড়াটাই মুক্তি – যে আমি একা নই, আমি একটা জটিল সামাজিক বুননের অংশ। আমার দায়িত্ব হলো সচেতনভাবে এই বুননে অংশ নেওয়া, ভালো প্রভাব ছড়ানো ও ভালো প্রভাব গ্রহণ করা।
একটু ভাবনা রেখে যান