ফজরের নামাজের পর কোরআন খুলে বসেছি। সূরা ইয়াসিন পড়ার ইচ্ছা। কিন্তু আরবি পড়তে পারি ঠিকমতো, অর্থ বুঝি না। তবুও পড়ি।
“ইয়া-সিন। ওয়াল কুরআনিল হাকিম।”
এই আওয়াজ কানে লাগার সাথে সাথে মনে একটা প্রশান্তি নামে। যেন কেউ আমার বুকের ওপর ঠান্ডা হাত রেখেছে।
আমি জানি না এই আয়াতের মানে কী। কিন্তু বুঝি এর মধ্যে একটা শক্তি আছে। একটা নিরাময় আছে।
“ইন্নাকা লামিনাল মুরসালিন। আলা সিরাতিম মুস্তাকিম।”
প্রতিটা শব্দ মুখ থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে মনে হয় আমার ভিতরের কোনো ময়লা পরিষ্কার হচ্ছে। আজ সকালে অফিসে যাওয়ার ভয়, কাজের চাপের চিন্তা, টাকার অভাবের দুশ্চিন্তা – সব কিছু যেন দূরে সরে যাচ্ছে।
কোরআন পড়ার সময় আমি অন্য মানুষ হয়ে যাই। সেই হায়দার নই যে অফিসে বসে টার্গেট নিয়ে চিন্তা করে। সেই হায়দার নই যে বাজারে দাম দেখে মনে কষ্ট পায়।
আমি হয়ে যাই একজন বান্দা। শুধু আল্লাহর বান্দা।
“ওয়ামা উনজিলা আলাইকা মিন রাব্বিকা ইল্লা লিতুনজিরা কাওমাম মা উনজিরা আবাউহুম ফাহুম গাফিলুন।”
এই আয়াত পড়ার সময় মনে হয় আল্লাহ আমার সাথে কথা বলছেন। আমি না বুঝলেও তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন।
হ্যাপি রান্নাঘরে কাজ করছে। পাশের ঘরে আরাশ ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু আমি এখন একা। শুধু আমি আর আল্লাহর কালাম।
“লাকাদ হাক্কাল কাওলু আলা আকছারিহিম ফাহুম লা ইউ’মিনুন।”
কোরআনের এই ধ্বনি অন্য রকম। এটা শুধু আওয়াজ নয়। এটা একটা কম্পন। যেটা আমার শরীরের ভিতর দিয়ে বয়ে যায়।
আমার মা কোরআন পড়তেন খুব সুন্দর করে। তার আওয়াজ শুনে মুগ্ধ হয়ে যেতাম। আমি তার মতো পড়তে পারি না। কিন্তু চেষ্টা করি।
“ইন্না জা’আলনা ফি আ’নাকিহিম আগলালান ফাহিয়া ইলাল আজকানি ফাহুম মুকমাহুন।”
এই আয়াত পড়ার সময় চোখে পানি এসে যায়। কেন জানি না। হয়তো আল্লাহর রহমত নাজিল হচ্ছে।
কোরআন পড়ার সময় আমি ভুলে যাই আমি কে। ভুলে যাই আমার সমস্যা। মনে হয় আমি একটা নদীর ধারে বসে আছি। শান্তির নদী।
“ওয়া জা’আলনা মিম বাইনি আইদিহিম সাদ্দাউ ওয়া মিন খালফিহিম সাদ্দান ফাআগশাইনাহুম ফাহুম লা ইউবসিরুন।”
প্রতিটা আয়াত একটা ওষুধের মতো। মনের ব্যথার ওষুধ। হৃদয়ের অশান্তির ওষুধ।
আমি জানি কোরআনে ১১৪টা সূরা আছে। ৬২৩৬টা আয়াত। সব পড়তে চাই। সব বুঝতে চাই। কিন্তু সময় কম। জীবনের ব্যস্ততা বেশি।
তবুও যতটুকু পারি, পড়ি।
“ওয়া মা আলাইনা ইল্লাল বালাগুল মুবিন।”
কোরআন পড়ার পর মনে হয় আমি রিচার্জ হয়ে গেছি। যেমন মোবাইল চার্জ দিলে শক্তি পায়, তেমনি আমার মন শক্তি পায়।
এখন অফিসে যেতে ভয় লাগছে না। কাজের চাপ নিয়ে চিন্তা হচ্ছে না। মনে হচ্ছে আল্লাহ আছেন। তিনি দেখছেন। তিনি সাহায্য করবেন।
“ক্বালু ইয়া ওয়াইলানা মাম বা’আছানা মিম মারকাদিনা। হাজা মা ওয়া’আদার রহমানু ওয়া সাদাকাল মুরসালুন।”
সূরা ইয়াসিন শেষ হলো। ১০ মিনিট লেগেছে। কিন্তু এই ১০ মিনিটে আমি ভ্রমণ করেছি অন্য জগতে।
কোরআন বন্ধ করে রাখি। কিন্তু এর প্রভাব থেকে যায়। সারাদিন মনে থাকে।
হ্যাপি এসে বলে, “কোরআন পড়লে?”
আমি বলি, “হ্যাঁ।”
হ্যাপি বলে, “তোমার মুখ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।”
আমি হাসি। কোরআনের নুর হয়তো মুখে ফুটে উঠেছে।
এই শান্তি, এই প্রশান্তি পৃথিবীর কোনো কিছুতে পাই না। শুধু কোরআনে।
আল্লাহ বলেছেন, “আলা বিজিকরিল্লাহি তাতমাইন্নুল কুলুব।” আল্লাহর জিকিরেই অন্তর শান্তি পায়।
এটা আমি প্রতিদিন অনুভব করি।
একটু ভাবনা রেখে যান