ব্লগ

যে নিঃস্বার্থতা আমার স্বার্থ

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গত রাতে আরাশ জ্বরে কাঁপছিল। আমি সারারাত তার পাশে বসে ছিলাম, কপালে পানি দিয়েছি, ওষুধ খাইয়েছি। হ্যাপি বলল, “তুমি কত নিঃস্বার্থ!” কিন্তু আমি ভাবলাম – আমি কি সত্যিই নিঃস্বার্থ ছিলাম? নাকি আমি আমার নিজের শান্তির জন্য, আমার বিবেকের জন্য, “ভালো বাবা” হওয়ার জন্য এই কাজ করেছিলাম?

নিঃস্বার্থতা কি আদৌ সম্ভব, নাকি আমাদের প্রতিটি কাজের পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো না কোনো স্বার্থ?

জামিউর যখন আর্থিক সমস্যায় পড়েছিল, আমি তাকে টাকা দিয়েছিলাম। সে কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হয়ে বলেছিল, “ভাই, তুমি আমার উপকার করলে।” কিন্তু আমি কি সত্যিই তার উপকার করেছিলাম? নাকি আমি “ভালো বন্ধু” হওয়ার সন্তুষ্টি পেয়েছিলাম? তার কৃতজ্ঞতা কি আমার অহংকারকে পুষ্ট করেনি?

সাইফুল কবিরের মা অসুস্থ হলে আমি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সবাই বলেছিল, “দেখ, কী ভালো মানুষ!” কিন্তু আমি যখন সেই প্রশংসা শুনেছিলাম, একটা গোপন আনন্দ পেয়েছিলাম। তাহলে আমার সেবা কি নিঃস্বার্থ ছিল, নাকি আমি সামাজিক স্বীকৃতির জন্য করেছিলাম?

দান করার সময় আমি ভাবি, “আল্লাহ খুশি হবেন।” কিন্তু এই “আল্লাহর খুশি” কি আমার নিজের সওয়াবের আকাঙ্ক্ষা নয়? আমি কি দরিদ্রের উপকারের জন্য দান করি, নাকি আমার নিজের আখেরাতের জন্য?

হ্যাপির সাথে যখন আমি ভদ্র আচরণ করি, তার কথা মন দিয়ে শুনি, তখন মনে হয় আমি একজন ভালো স্বামী। কিন্তু এই “ভালো স্বামী” হওয়ার পেছনে কি আমার নিজের শান্তির আকাঙ্ক্ষা নেই? আমি কি চাই না যে হ্যাপিও আমার সাথে ভালো আচরণ করুক?

মৃদুলকে যখন আমি কানাডায় যাওয়ার ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছিলাম, আমি ভেবেছিলাম আমি তার ভালোর জন্য করছি। কিন্তু আমি কি গোপনে চাইনি যে মৃদুল সফল হয়ে আমার পরামর্শের কৃতিত্ব প্রমাণ করুক?

আমার মনে হয়, মানুষের প্রতিটি কাজের পেছনে একটা স্বার্থ থাকে। এমনকি যেগুলোকে আমরা “নিঃস্বার্থ” বলি, সেগুলোর পেছনেও কোনো না কোনো ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি, স্বীকৃতি, বা শান্তির আকাঙ্ক্ষা কাজ করে।

কিন্তু এতে কি কিছু ভুল আছে? আমি যদি আরাশের সেবা করি কারণ তাতে আমার শান্তি আছে, তাহলে কি সেটা খারাপ? আরাশের তো উপকার হচ্ছে। আমার অনুপ্রেরণা যাই থাকুক, ফলাফল তো ভালো।

হয়তো নিঃস্বার্থতার সংজ্ঞাই ভুল। হয়তো আমাদের মনে করা উচিত নয় যে নিঃস্বার্থতা মানে সম্পূর্ণ স্বার্থমুক্ততা। হয়তো নিঃস্বার্থতা মানে এমন স্বার্থ যেটা অন্যের কল্যাণের সাথে মিলে যায়।

যখন আমি আরাশের যত্ন নিই, আমি আমার শান্তির জন্যও করি। কিন্তু আমার শান্তি আরাশের সুস্থতার সাথে জড়িত। আমার স্বার্থ আর তার স্বার্থ এক হয়ে গেছে। এটা কি এক ধরনের নিঃস্বার্থতা নয়?

হ্যাপির খুশিতে আমি খুশি। তার দুঃখে আমি দুঃখী। আমার আবেগ তার আবেগের সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে আমি আর বলতে পারি না কোনটা আমার স্বার্থ আর কোনটা তার। এই মিশে যাওয়া কি নিঃস্বার্থতার একটা রূপ?

জামিউরের সমস্যার সমাধানে আমি যখন আনন্দ পাই, সেটা কি আমার অহংকার, নাকি আমার ভালোবাসা? হয়তো দুটোই। হয়তো ভালোবাসা আর অহংকার সবসময় আলাদা থাকে না।

আমার মনে হয়, সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থতা হয়তো অসম্ভব, কিন্তু সেটাই হয়তো মানুষের সৌন্দর্য। আমরা স্বার্থপর প্রাণী, কিন্তু আমাদের স্বার্থ এমনভাবে বিকশিত হয়েছে যে অন্যের কল্যাণে আমাদের কল্যাণ।

মা যখন সন্তানের জন্য নিজেকে ত্যাগ করেন, সেটা কি নিঃস্বার্থতা? নাকি মায়ের জন্য সন্তানের সুখই তার নিজের সুখ? হয়তো দুটোই সত্য।

বাবা যখন আমাদের জন্য কষ্ট করতেন, সেটা কি নিঃস্বার্থতা ছিল? নাকি আমাদের সফলতায় তার গর্ব ছিল? হয়তো তার স্বার্থ আর আমাদের স্বার্থ এক ছিল।

নামাজ পড়ার সময় আমি আল্লাহর জন্য সেজদা করি। কিন্তু আমি জানি এতে আমার শান্তি আছে, আমার সওয়াব আছে। আমার এই আবাদত কি নিঃস্বার্থ? নাকি এটা একটা উচ্চতর স্বার্থ?

হয়তো প্রশ্নটাই ভুল। নিঃস্বার্থতা সম্ভব কি অসম্ভব – এটা নিয়ে ভাবার চেয়ে ভাবা উচিত আমাদের স্বার্থ কীভাবে অন্যদের স্বার্থের সাথে মিলিয়ে দেওয়া যায়।

আমার স্বার্থ যদি হয় আমার পরিবারের সুখ, তাহলে আমি নিঃস্বার্থভাবে তাদের সেবা করতে পারি। আমার স্বার্থ যদি হয় সমাজের কল্যাণ, তাহলে আমি নিঃস্বার্থভাবে সমাজসেবা করতে পারি।

এই লেখাটা লিখতে লিখতে আমার মনে হচ্ছে, নিঃস্বার্থতা হয়তো একটা বিশুদ্ধ অবস্থা নয়, বরং একটা দিক। যখন আমাদের স্বার্থ অন্যদের স্বার্থের সাথে মিলে যায়, যখন আমাদের সুখ অন্যের সুখের উপর নির্ভর করে, তখনই আমরা নিঃস্বার্থতার দিকে এগিয়ে যাই।

হয়তো নিঃস্বার্থতার সংজ্ঞা হলো না “কোনো স্বার্থ না থাকা,” বরং “এমন স্বার্থ থাকা যেটা অন্যদের মঙ্গলের সাথে সংযুক্ত।”

আর হয়তো এটাই যথেষ্ট। এটাই মানুষের জন্য সম্ভব, এবং এটাই সুন্দর।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *