গতকাল রাতে হ্যাপি অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। আমি সারারাত তার সেবা করেছি – ওষুধ দিয়েছি, কপালে পানি দিয়েছি, চা বানিয়েছি। সকালে যখন তার শরীর ভালো হল, সে কৃতজ্ঞতায় বলল, “তুমি কত ভালো!” কিন্তু আমি তখন অদ্ভুত এক শূন্যতা অনুভব করলাম। যেন রাতভর অন্যের যত্নে আমি নিজেকে কোথাও হারিয়ে ফেলেছি।
বাসে উঠে দেখি একজন মা তার অসুস্থ শিশুকে কোলে নিয়ে বসে আছেন। শিশুটি কাঁদছে, মা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। তার নিজের মুখে ক্লান্তি, কিন্তু শিশুর দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি ভাবলাম – এই মা কি নিজের অস্তিত্ব ভুলে গেছেন? নাকি শিশুর মধ্যেই তার অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন?
রাস্তায় দেখি একজন রিকশাওয়ালা তার বৃদ্ধ বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি নিজে অসুস্থ দেখাচ্ছেন, কিন্তু বাবার যত্নে মগ্ন। রিকশা চালাতে চালাতে বারবার পেছনে ফিরে দেখছেন বাবা ঠিক আছেন কিনা। তার নিজের কষ্ট তিনি ভুলে গেছেন।
হাসপাতালে দেখি একজন নার্স সারাদিন রোগীদের সেবা করছেন। তার নিজের খাওয়ার সময় হয়নি, বিশ্রামের সময় হয়নি। কিন্তু প্রতিটি রোগীর কাছে তিনি হাসিমুখে যাচ্ছেন। তার নিজের ক্লান্তি তিনি লুকিয়ে রেখেছেন।
আমার মনে হয়, সেবা করতে গিয়ে আমরা কখনো কখনো নিজেদের হারিয়ে ফেলি। অন্যের প্রয়োজন আমাদের নিজের প্রয়োজনের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। অন্যের ব্যথা আমাদের নিজের ব্যথা ভুলিয়ে দেয়।
জামিউরের মা অসুস্থ হলে জামিউর নিজের সব কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল। মায়ের সেবায় এমনভাবে মগ্ন হয়েছিল যে নিজের স্বাস্থ্যের কথা ভুলে গিয়েছিল। মা সুস্থ হওয়ার পর জামিউর নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।
সাইফুল কবির তার প্রতিবেশীদের সব সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে নিজের পরিবারের সময় দিতে পারে না। সে বলে, “মানুষের সেবা করা তো ধর্ম।” কিন্তু তার স্ত্রী অভিযোগ করে যে সে নিজের পরিবারের কথা ভুলে যায়।
চায়ের দোকানে বসে দেখি দোকানদার একজন গরিব মানুষকে বিনা পয়সায় চা দিচ্ছেন। এটা দেখে আরো কয়েকজন গরিব মানুষ এসেছে। দোকানদার সবাইকে চা দিয়ে দিয়ে নিজের লোকসান করছেন। তার দয়া তার ব্যবসার ক্ষতি করছে।
মার্কেটে দেখি একজন বৃদ্ধ তার অক্ষম ছেলেকে সাথে নিয়ে কাজ করছেন। ছেলের যত্ন নিতে গিয়ে তার নিজের কাজে মনোযোগ দিতে পারছেন না। কিন্তু ছেলেকে একা রেখে যেতেও পারছেন না।
আমার মনে হয়, সেবা একটা দোতলা। এটা আমাদের মহৎ করে তোলে, কিন্তু কখনো কখনো আমাদের নিঃশেষ করে দেয়। এটা আমাদের অর্থ দেয়, কিন্তু কখনো কখনো আমাদের পরিচয় কেড়ে নেয়।
পার্কে দেখি একজন দাদি তার নাতি-নাতনিদের নিয়ে ব্যস্ত। তাদের খেলা দেখছেন, তাদের ঝগড়া মেটাচ্ছেন, তাদের যত্ন নিচ্ছেন। তার নিজের কোনো ইচ্ছা নেই, শুধু তাদের খুশি রাখা।
ট্রেনে দেখি একজন যুবক তার অন্ধ মাকে নিয়ে যাচ্ছেন। মায়ের প্রতিটা প্রয়োজনের কথা তিনি জানেন। কিন্তু তার নিজের জীবনের কী হচ্ছে? তার নিজের স্বপ্নগুলো কোথায় গেল?
আমার নিজের কথা ভাবি। বাবার মৃত্যুর পর আমি পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। মায়ের যত্ন, দেয়া বোনের বিয়ে, নিজের পড়াশোনা – সবকিছু একসাথে। সেই সময় আমার নিজের কোনো ইচ্ছা ছিল না। শুধু সবার সেবা করে যাওয়া।
কিন্তু সেই সেবা করতে গিয়ে আমি কি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম? আমার যে স্বপ্ন ছিল কবি হওয়ার, লেখালেখি করার – সেটা কি দায়িত্বের চাপে চাপা পড়ে গিয়েছিল?
হ্যাপিও এমনই। আমার ও আরাশের সেবায় এতটাই মগ্ন যে তার নিজের কোনো স্বতন্ত্র ইচ্ছা আছে কিনা আমি জানি না। সে কী চায়, কী ভাবে – এসব কি আমাদের প্রয়োজনে হারিয়ে গেছে?
আরাশের জন্য আমি এত পরিকল্পনা করি, এত চিন্তা করি যে কখনো কখনো ভুলে যাই আমার নিজের জীবন কী চায়। তার ভবিষ্যৎ আমার বর্তমানের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।
রিকশায় চড়ে দেখি রিকশাওয়ালা তার স্ত্রীকে ফোনে বলছেন, “তুই চিন্তা করিস না, সবকিছু আমি দেখব।” কিন্তু তার নিজের শরীর ভেঙে পড়ছে অতিরিক্ত পরিশ্রমে। তার সেবা তার নিজের স্বাস্থ্য নষ্ট করছে।
আমার মনে হয়, সেবা আর আত্মবিলোপ – এই দুটোর মধ্যে একটা সূক্ষ্ম সীমানা আছে। সেবা করা মানে নিজেকে সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলা নয়। সেবা করা মানে নিজেকে বিস্তৃত করা।
মসজিদে দেখি ইমাম সাহেব সবার সেবায় ব্যস্ত। কিন্তু তার নিজের ইবাদতের সময়ও তিনি বের করেন। তিনি জানেন যে নিজেকে ভালো রাখতে পারলেই অন্যদের ভালো সেবা দিতে পারবেন।
হয়তো প্রকৃত সেবা হলো নিজেকে হারিয়ে ফেলা নয়, বরং নিজেকে এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে আরো ভালো সেবা করতে পারি। নিজের যত্ন নেওয়া মানে স্বার্থপরতা নয়, অন্যদের আরো ভালো সেবা দেওয়ার প্রস্তুতি।
এই লেখাটা লিখতে লিখতে আমার মনে হচ্ছে, আমার শেখা উচিত কীভাবে সেবা করতে হয় নিজেকে না হারিয়ে। কীভাবে অন্যের যত্ন নিতে হয় নিজের যত্ন নেওয়াও ভুলে না গিয়ে।
হয়তো সবচেয়ে বড় সেবা হলো এমন একটা মানুষ হয়ে ওঠা যে দীর্ঘদিন ধরে সেবা করে যেতে পারে। আর তার জন্য নিজেকে সুস্থ, সুখী আর পূর্ণ রাখা দরকার।
কারণ হারিয়ে যাওয়া মানুষ হয়তো ক্ষণিকের সেবা দিতে পারে, কিন্তু জীবনব্যাপী সেবা দিতে পারে না।
একটু ভাবনা রেখে যান