ব্লগ

নামাজের সেজদায় অফিসের ফাইল

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

“আল্লাহু আকবার” বলে নামাজে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু মন দাঁড়ায়নি। মন এখনো অফিসে বসে আছে।

“সুবহানাকা আল্লাহুম্মা…” পড়ছি। কিন্তু মাথায় ঘুরছে কালকের মিটিংয়ের কথা। স্যার কী বলবেন? প্রেজেন্টেশন ঠিক আছে তো? PowerPoint এর তৃতীয় স্লাইডে একটা ভুল আছে মনে হয়। এখনই বাড়ি গিয়ে ঠিক করতে হবে।

“ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাঈন।” আপনারই ইবাদত করি, আপনারই কাছে সাহায্য চাই। কিন্তু আমি তো এখন চাকরির সাহায্য চাইছি মনে মনে।

রুকুতে গেছি। “সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম।” আমার প্রভু মহান। কিন্তু মনে হচ্ছে অফিসের বস আমার আসল প্রভু। তার কথাই তো মানি সবসময়।

সেজদায় গেছি। কপাল মাটিতে লাগিয়েছি। এই মুহূর্তে আমি আল্লাহর সবচেয়ে কাছে। “সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা।” কিন্তু মনে ভাসছে আগামীকালের টার্গেটের কথা। ১৫টা কল করতে হবে। ৩টা মিটিং। ২টা রিপোর্ট জমা দিতে হবে।

এটা কী হচ্ছে আমার সাথে? আমি কি আল্লাহর সাথে নামাজ পড়ছি নাকি অফিসের সাথে?

দ্বিতীয় রাকাতে “আত্তাহিয়্যাতু…” পড়ছি। শান্তি বর্ষিত হোক আল্লাহর ওপর। কিন্তু আমার মনে শান্তি নেই। ভাবছি হ্যাপি রাতের খাবার রান্না করেছে কিনা। আরাশের হোমওয়ার্ক কে দেখবে?

নামাজ শেষ করে দোয়া করি। “রাব্বিগফির লি জুনুবি ওয়া খাতায়ি।” হে আল্লাহ, আমার গুনাহ মাফ করুন। প্রথম গুনাহই হলো নামাজে মনোযোগ না দেওয়া।

আমি জানি এটা ঠিক না। আমি জানি নামাজের সময় পুরো মনোযোগ আল্লাহর দিকে থাকা উচিত। কিন্তু পারি না। অফিসের চাপ এত বেশি যে সেটা নামাজেও ছাড়ে না।

মাঝে মাঝে ভাবি, আমি কি মুনাফিক? মুখে আল্লাহর কালাম পড়ছি, মনে দুনিয়ার চিন্তা। এটা কি ইসলাম?

বাবার কথা মনে পড়ে। তিনি নামাজ পড়তেন একাগ্রতা দিয়ে। কখনো দেখিনি তার মনোযোগ অন্যদিকে। আমি কেন পারি না?

হয়তো বাবার যুগে চাপ কম ছিল। হয়তো সেই সময় জীবিকার জন্য এত দৌড়াতে হতো না। এখন তো একটা মিস করলেই চাকরি যাওয়ার ভয়।

কিন্তু এগুলো সব অজুহাত। আসল কথা হলো আমি আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে পারছি না। অফিসকে দিচ্ছি।

এই যে অফিসের ভয়, বসের ভয়, চাকরি হারানোর ভয় – এগুলো কি আল্লাহর ভয়ের চেয়ে বড় হয়ে গেছে?

হ্যাপিকে বলেছিলাম এই সমস্যার কথা। হ্যাপি বলেছিল, “নামাজের আগে পাঁচ মিনিট বসে থাকো। মনকে শান্ত করো।” চেষ্টা করেছি। কিন্তু সেই পাঁচ মিনিটেও অফিসের চিন্তা আসে।

আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। চাই এই জন্য যে আমি তার সাথে থাকার সময়েও অন্য কিছু ভাবি। চাই এই জন্য যে আমি তার চেয়ে দুনিয়াকে বেশি গুরুত্ব দিই।

কিন্তু সমাধান কী? চাকরি ছেড়ে দেব? তাহলে সংসার চলবে কিভাবে? আল্লাহ তো বলেছেন রিজিকের জন্য চেষ্টা করতে। কিন্তু সেই চেষ্টা যদি নামাজেও বাধা দেয়?

হয়তো আমার ঈমান কম। হয়তো আমার তাওয়াক্কুল কম। হয়তো আমি আল্লাহর ওপর পুরো ভরসা করতে পারি না।

আজ রাতে আবার চেষ্টা করব। এশার নামাজে মন থেকে সব অফিসের চিন্তা সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব। দেখি পারি কিনা।

কারণ আমি জানি, যে নামাজে মনোযোগ নেই, সেই নামাজ আল্লাহ কবুল করেন না। আর যদি আল্লাহ আমার নামাজ কবুল না করেন, তাহলে আমার বাকি সব চেষ্টাও বৃথা।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *