ব্লগ

যে ভাষা কখনো শেখা হল না

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

হ্যাপি যখন আমার জন্য নতুন শার্ট কিনে এনেছে, আমি শুধু বলেছি, “কত দাম হয়েছে?”

“তুমি দেখেছ কেমন লাগছে?” হ্যাপি জানতে চেয়েছিল।

“ভালো।” এই একটা শব্দেই আমার সব প্রশংসা।

কিন্তু আমার মন বলছিল অন্য কথা। আমার বলতে ইচ্ছা করছিল, “তুমি আমার পছন্দ কত ভালো জানো। তুমি আমার চেয়ে ভালো জানো কোন রং আমাকে মানায়। তুমি আছ বলে আমি এত সুন্দর জামা পাই।”

কিন্তু এই কথাগুলো আমার গলা দিয়ে বেরোল না।

কেন?

আমার বাবা কখনো আমার মাকে প্রশংসা করেননি আমার সামনে। আমার দাদাও করেননি। আমাদের পরিবারে পুরুষরা মনের কথা বলে না। আমরা শুধু দায়িত্ব পালন করি।

কিন্তু এই নীরবতা কি সত্যিই পুরুষত্ব?

আমার বন্ধু মৃদুল কানাডায় গিয়ে বদলে গেছে। সে তার স্ত্রীকে ফোনে বলে, “I love you.” আমি তার কথা শুনে হেসেছিলাম। ভেবেছিলাম, অনেক বাড়াবাড়ি।

কিন্তু আমি কি হ্যাপিকে ভালোবাসি না? আমি কি তাকে বলতে পারি না?

সমস্যা হচ্ছে, আমি জানি না কীভাবে বলতে হয়।

“তোমাকে ভালোবাসি” – এই কথাটা আমার কাছে এত কৃত্রিম লাগে। মনে হয় সিনেমার সংলাপ।

তাহলে আমি কীভাবে প্রেম প্রকাশ করি? আমি হ্যাপির জন্য ওষুধ কিনে আনি অসুস্থ হলে। আমি তার বাবা-মায়ের খবর নিই। আমি রাতে তার পাশে শুয়ে থাকি।

কিন্তু হ্যাপি কি এই নিরব ভালোবাসা বোঝে?

গত সপ্তাহে হ্যাপি খুব সুন্দর একটা শাড়ি পরেছিল। আমার খুব ভালো লেগেছিল। কিন্তু আমি বলিনি। সে নিজেই জিজ্ঞেস করেছিল, “কেমন লাগছি?”

আমি বলেছি, “ঠিক আছে।”

হ্যাপির মুখে হতাশা ফুটে উঠেছিল।

আমি কি এত কৃপণ? একটা “সুন্দর” শব্দ বলতেও এত কষ্ট?

আমার মনে পড়ে আমার মায়ের কথা। তিনি সারাজীবন আমার বাবার প্রশংসার অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু বাবা কখনো বলেননি, “তুমি ভালো রান্না কর।” বা “তুমি ঘরটা সুন্দর সাজিয়েছ।”

আমি কি আমার মায়ের মতো হ্যাপিকেও অপেক্ষায় রাখছি?

আমার একটা সহকর্মী ছিল, রানা। সে তার স্ত্রীর সাথে ইংরেজিতে কথা বলত। আমার অবাক লাগত। কিন্তু সে বলত, “বাংলায় রোমান্টিক কথা বলা কঠিন। ইংরেজি সহজ।”

হয়তো রানা ঠিক বলেছিল। বাংলা ভাষায় প্রেমের অভিব্যক্তি প্রকাশের শব্দ কম। নাকি আমরা সেই শব্দগুলো ভুলে গেছি?

আমার ঠাকুরদা নাকি ঠাকুরমাকে কবিতা শোনাতেন। কিন্তু সেই ঐতিহ্য আমাদের পরিবারে আর নেই।

আমি চেষ্টা করেছি হ্যাপিকে কবিতা শোনাতে। কিন্তু আমার গলা শুকিয়ে যায়। মনে হয় আমি কোনো নাটক করছি।

তাহলে কি আমি একটা ভাবপ্রবণতাহীন পুরুষ?

না, আমার ভাবপ্রবণতা আছে। আমি আরাশকে প্রথম কোলে নেওয়ার সময় কেঁদেছিলাম। আমি হ্যাপির অসুখে পাগল হয়ে যাই।

কিন্তু এই আবেগ প্রকাশ করতে পারি না।

কেন পারি না?

লজ্জা? ভয়? নাকি এই ধারণা যে পুরুষরা আবেগ দেখায় না?

আমি হ্যাপিকে আজ বলার সিদ্ধান্ত নিলাম। তার রান্নার প্রশংসা করব।

সন্ধ্যায় খেতে বসে বললাম, “খুব ভালো রান্না হয়েছে।”

হ্যাপি চমকে গেল। “সত্যি?”

“হ্যাঁ।”

হ্যাপির মুখে যে হাসি ফুটে উঠল, সেটা দেখে আমি বুঝলাম – আমি কত বড় ভুল করে এসেছি এতদিন।

একটা সাধারণ প্রশংসাতেই হ্যাপি এত খুশি।

আমি আর কতদিন নীরব থাকব?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *