ব্লগ

শেকলের মালিক

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে আলার্ম বাজার আগেই ফোনের নোটিফিকেশনে ঘুম ভেঙে গেল। ইমেইল, মেসেজ, অ্যাপ আপডেট। ঘুম থেকে উঠেই আমি সেবা করতে শুরু করলাম ছোট্ট একটা যন্ত্রের। রাতে যেটা চার্জে দিয়েছিলাম, সকালে সেটাই আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

প্রশ্ন জাগল মনে – আমি কি টেকনোলজির মালিক নাকি দাস?

অফিস যেতে গুগল ম্যাপ বলল কোন রাস্তা দিয়ে যেতে হবে। আমি অন্ধের মতো সেই পথ ধরলাম। নিজের পাড়া চিনি, তবুও গুগলের উপর নির্ভর করলাম। এটা কি দাসত্ব?

বাড়ি ফিরে আরাশকে দেখি সে তার আর্ট প্রোজেক্ট করছে AI টুলের সাহায্যে। “তুই কি মনে করিস তুই এই টুলের মালিক নাকি দাস?”

“বাবা, আমি এটা ব্যবহার করি আমার কল্পনা বাস্তবায়নের জন্য। কিন্তু কখনো কখনো এটা এমন কিছু দেখায় যা আমি ভাবিনি। তখন মনে হয় এটা আমাকে শেখাচ্ছে।”

“তাহলে কে মালিক?”

“হয়তো দুজনেই। আমি এটাকে কমান্ড দিই, এটা আমাকে আইডিয়া দেয়।”

আমার ভিতরে একটা অ্যাপ রিবুট হলো যার নাম “নিয়ন্ত্রণের দর্শন ভার্সন সহযোগিতা”।

হ্যাপিকে বললাম, “আমাদের কি লাগে যে আমরা টেকনোলজির গুলাম?”

“তুমি কেন এমন ভাবছো?”

“সারাদিন ফোনে ব্যস্ত থাকি। এটা বাজলেই ছুটে যাই। এটা যা বলে তা করি।”

হ্যাপি বলল, “হায়দার, কিন্তু তুমি যখন চাকরি ছেড়ে দাও সততার জন্য, তখন কি ফোন বলে দেয়? তোমার সিদ্ধান্ত তুমিই নাও।”

আমি থেমে গেলাম। সত্যি তো। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আমিই নিই।

পরদিন রহিম চাচার সাথে এই নিয়ে কথা বলছিলাম। “চাচা, আজকালকার যুগে মানুষ কি টেকনোলজির দাস?”

চাচা হেসে বলললেন, “বাবা, ছুরি দিয়ে তুমি সবজি কাটতে পারো, আবার কাউকে মারতেও পারো। ছুরি কি তোমার মালিক?”

“না।”

“তাহলে ফোনও তোমার মালিক না। তুমি যেভাবে ব্যবহার করো, সেটাই নির্ধারণ করে তুমি মালিক নাকি দাস।”

নামাজ পড়ে ভাবছিলাম। আল্লাহ আমাদের আক্বল দিয়েছেন, ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। টেকনোলজি একটা টুল। আমি সেটাকে কীভাবে ব্যবহার করি, সেটা আমার পছন্দ।

আরাশকে বললাম, “তুই যখন AI দিয়ে আর্ট বানাস, তুই কি মনে করিস তোর creativity কমে যায়?”

“না বাবা। বরং বাড়ে। আমি যা ভাবতে পারতাম না, সেটা ভাবতে পারি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমিই ঠিক করি কোনটা ভালো।”

“তার মানে?”

“মানে, টুল আমার হাতকে শক্তিশালী করে, কিন্তু আমার মাথা আমারই থাকে।”

আমি বুঝলাম। সমস্যা টেকনোলজিতে নয়, আমাদের সচেতনতায়। যখন আমরা অভ্যাসের দাস হয়ে যাই, তখন আমরা টেকনোলজিরও দাস হয়ে যাই।

কিন্তু যখন আমরা সচেতনভাবে ব্যবহার করি, তখন আমরাই মালিক।

হ্যাপিকে বললাম, “আমি একটা পরীক্ষা করব। একদিন ফোন ছাড়া বেরোব।”

“কেন?”

“দেখতে চাই আমি ফোন ছাড়া চলতে পারি কিনা।”

পরদিন সত্যিই ফোন ঘরে রেখে বেরোলাম। প্রথমে অস্বস্তি লাগল। কিন্তু ধীরে ধীরে অনুভব করলাম – আমি আছি। আমার চোখ, কান, মস্তিষ্ক সব কাজ করছে। রাস্তা চিনতে পারছি। মানুষের সাথে কথা বলতে পারছি।

ফিরে এসে আরাশকে বললাম, “আজ ভালো লাগল।”

“কেন?”

“কারণ আজ মনে হলো আমি নিজের মালিক।”

টেকনোলজির দাস নাকি মালিক – এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের প্রতিদিনের পছন্দের মধ্যে।

যদি আমরা সচেতনভাবে ব্যবহার করি, আমরা মালিক। যদি অন্ধভাবে অনুসরণ করি, আমরা দাস।

শেকল থাকলেই দাসত্ব হয় না। শেকলের চাবি কার হাতে, সেটাই আসল কথা।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *