জীবন

পাপড়ি

অক্টোবর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

ভোরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। চা হাতে। এখনো গরম।

পাশের বাড়ির কৃষ্ণচূড়া গাছ থেকে একটা পাপড়ি হাওয়ায় উড়ে এল। লাল। আমার পায়ের কাছে পড়ল।

কোনো শব্দ হয়নি।

পাপড়িটা তুলে নিলাম। নরম। হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। চা ঠান্ডা হতে লাগল।


কলেজের বসন্তে শিমুল ফুল ঝরত ক্যাম্পাসে। আমরা বেঞ্চে বসে পরীক্ষার জন্য পড়তাম। মাথায় ফুল এসে পড়ত। ঝেড়ে ফেলতাম।

সাইফুল বলেছিল, “প্রতি বছর এই দৃশ্য।”

আমি বলেছিলাম, “হুম।”

বাবু খাতায় লিখছিল। মাথা তুলে বলল, “এই বেঞ্চ, এই গাছ — সব তো থাকবে।”

থাকেনি।

পরের বছর আবার শিমুল ফুটল। আমি সেই বেঞ্চে ছিলাম না। সাইফুল চাকরি নিয়ে ঢাকা চলে গেছে। বাবু বিয়ে করে চট্টগ্রামে।

ফুল ফুটল। কিন্তু আমরা ছিলাম না।


গত বছর নানি মারা যাওয়ার আগে তিন দিন হাসপাতালে তার পাশে বসেছিলাম।

অক্সিজেনের নল লাগানো। চোখ বন্ধ। শ্বাস নিচ্ছেন ধীরে ধীরে।

আমি তার হাত ধরে বসে থাকতাম। হাতটা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। শিরায় রক্ত কমে আসছে। দেখতে পাচ্ছিলাম।

মাঝে মাঝে চোখ খুলতেন। আমার দিকে তাকাতেন। কিছু বলতে চাইতেন। পারতেন না।

আমি তার হাত আরও শক্ত করে ধরতাম।

তৃতীয় রাতে তিনি চলে গেলেন। হাতটা একদম ঠান্ডা হয়ে গেল।

আমি হাত ছাড়িনি। অনেকক্ষণ ধরে বসে ছিলাম।

নার্স এসে বলল, “আসেন।”

আমি উঠলাম না।

নার্স আবার বলল, “উনি চলে গেছেন।”

জানি। কিন্তু হাত ছাড়তে পারছিলাম না।


ছোটবেলায় মায়ের সাথে বাজারে গিয়েছিলাম। ঈদের কেনাকাটা।

নতুন জামা কিনেছি। নীল রঙের। পকেটে চেক।

রাস্তার মোড়ে আইসক্রিম খেয়েছি। ভ্যানিলা ফ্লেভার।

সন্ধ্যায় মায়ের হাত ধরে হাঁটছি। দোকানে লাইট জ্বলছে। মা হাঁটছেন ধীরে। আমি লাফাচ্ছি।

সেই রাতে জামা পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। মনে হয়েছিল আমি অন্যরকম হয়ে গেছি।

মা দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। হাসছিলেন।

এখন ঈদে নতুন জামা কিনি। কিন্তু সেই অনুভূতি নেই। জামা একটা কাপড় মাত্র।

আর মা এখন বুড়ো। চুলে সাদা। পিঠ বেঁকে গেছে। বাজারে গেলে আমি তার হাত ধরি। উনি আর আমার হাত ধরেন না।


গত সপ্তাহে বৃষ্টি হচ্ছিল। ছাদে উঠলাম। দাঁড়িয়ে রইলাম।

জামা ভিজে গেল। চুল ভিজে গেল। ঠান্ডা লাগছিল।

কিন্তু সেই বৃষ্টির গন্ধ। সেই ঠান্ডা হাওয়া। মনে হচ্ছিল এই অনুভূতিটা যদি কোথাও রাখতে পারতাম।

পারি না।

বৃষ্টি থেমে গেছে। ছাদ শুকিয়ে গেছে। এখন শুধু মনে আছে একটা ধোঁয়াশা ছবি। সেটাও ক্রমশ ঝাপসা হচ্ছে।


হ্যাপি একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি ছবি তোলো না কেন?”

আমি বললাম, “ভুলে যাই।”

সে বলল, “ভুলে গেলে তো মনে থাকবে না।”

আমি বললাম, “ছবিতেও তো থাকে না।”

সে চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তাহলে কী থাকে?”

জানি না। হয়তো কিছুই না।


আরাশ একবার বলেছিল, “বাবা, তুমি কেন মাঝে মাঝে দূরে থাকো?”

আমি বললাম, “দূরে তো না। তোমার পাশেই তো আছি।”

সে বলল, “না। তুমি এখানে আছো কিন্তু দেখছো না।”

আমি তাকিয়ে রইলাম। সে ঠিক বলেছে।

সে বলল, “কোথায় থাকো তখন?”

আমি বললাম, “জানি না।”

সে আমার হাত ধরল। বলল, “এখন আছো?”

আমি বললাম, “হ্যাঁ। এখন আছি।”


সেদিন বারান্দায় সেই পাপড়িটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। নরম ছিল। কিন্তু জানতাম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এটা শুকিয়ে যাবে। রং বদলে যাবে। ভেঙে যাবে।

হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। চা একদম ঠান্ডা হয়ে গেল। খাইনি।

পাপড়িটা দেখছিলাম। শুধু দেখছিলাম। কিছু ভাবছিলাম না।

হ্যাপি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, “কী দেখছো?”

আমি বললাম, “ফুল।”

সে এগিয়ে এল। দেখল। বলল, “সুন্দর।”

আমি বললাম, “হুম।”

সে বলল, “রেখে দেবে?”

আমি বললাম, “না। শুকিয়ে যাবে তো।”

সে বলল, “তাহলে?”

আমি বললাম, “কিছু না। শুধু দেখছি।”


সেই রাতে ঘুমানোর আগে জানালা খুলে রাখলাম। হাওয়া এল। চলে গেল।

আমি আটকে রাখার চেষ্টা করিনি। শুধু শুয়ে রইলাম। অনুভব করলাম।

হ্যাপি পাশে ঘুমাচ্ছিল। শ্বাস নিচ্ছিল ধীরে ধীরে। আরাশ তার ঘরে।

সবাই ঘুমিয়ে। আমি জেগে।

আবার হাওয়া এল। আবার চলে গেল।

আমি চোখ বন্ধ করলাম।


আগামীকাল আবার পাশের গাছ থেকে ফুল উড়ে আসবে হয়তো।

আমি কি সেখানে থাকব?

জানি না।

কিন্তু আজকে ছিলাম। পুরোপুরি।

সেটুকুই।

অনুভূতি জীবনবোধ জীবনের-পাঠ পরিবর্তন স্মৃতিচারণ

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

ইসলাম

দর্পণ

অক্টোবর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *