দাদুর মুখে শুনেছি “আদাব” শব্দ। এখন আমরা বলি “সালাম।” আরাশ বলে “Hi।” একই অভিবাদন, তিন যুগের তিন ভাষা।
ভাষা বদলায়, আমাদের ভাবনাও কি বদলায়?
“আদাব” শব্দে একটা আনুষ্ঠানিকতা ছিল। সম্মান ছিল। “সালাম” এ ধর্মীয় ছোঁয়া। “Hi” তে বন্ধুত্ব। ভাষা বদলে গেলে সম্পর্কের স্বরূপও বদলে গেছে।
আমাদের দাদুরা “ইজ্জত” বলতেন। আমরা বলি “সম্মান।” আরাশের প্রজন্ম বলে “Respect।” একই ভাব, কিন্তু গভীরতার পার্থক্য।
“ইজ্জত” শব্দে যে তীব্রতা, “সম্মান” এ সেটা কম। “Respect” এ আরো কম।
আমরা কি ভাষার সাথে আবেগও হারিয়ে ফেলছি?
আগে “ভালোবাসা” বলতাম। এখন “Love” বলি। কিন্তু “ভালোবাসা” শব্দে যে উষ্ণতা, সেটা “Love” এ নেই। ভাষা বদলে প্রেমের স্বাদও বদলেছে।
নতুন শব্দ আসে, পুরনো চিন্তা মিশে যায়।
“ডেটিং” শব্দ এসেছে। আগে এর কোনো বাংলা ছিল না। কারণ এই ধারণাটাই ছিল না। এখন শব্দ এসেছে, ধারণাও এসেছে। ভাষা নতুন চিন্তার জন্ম দেয়।
“স্ট্রেস” বলি এখন। আগে কী বলতাম? “চিন্তা?” “কষ্ট?” কিন্তু “স্ট্রেস” অন্যরকম। এটা আধুনিক জীবনের নতুন অনুভূতি। নতুন শব্দ, নতুন সমস্যা।
প্রযুক্তি এসেছে, ভাষাও বদলেছে। “পোস্ট করা,” “শেয়ার করা,” “লাইক দেওয়া”—এগুলো পাঁচ বছর আগেও ছিল না।
নতুন শব্দ মানে নতুন কর্মকাণ্ড। নতুন চিন্তার জগৎ।
কিন্তু কিছু শব্দ হারিয়ে যাচ্ছে। “শ্রদ্ধা” শব্দ কত কম ব্যবহার হয়! “ভক্তি,” “নিবেদন,” “আনুগত্য”—এগুলো পুরনো মনে হয়।
হারিয়ে যাওয়া শব্দের সাথে হারিয়ে যায় সেই মূল্যবোধ।
আরাশ “Awesome” বলে সবকিছুর জন্য। খাবার awesome, মুভি awesome, গান awesome। একটা শব্দে সব অনুভূতি। কিন্তু “অপূর্ব,” “অসাধারণ,” “চমৎকার”—এগুলোর সূক্ষ্ম পার্থক্য সে জানে না।
ভাষা সরল হচ্ছে, কিন্তু চিন্তাও কি সরল হয়ে যাচ্ছে?
অফিসে “ফাস্ট” বলি। “দ্রুত” বলি না। “প্রবলেম” বলি, “সমস্যা” বলি না। ইংরেজি শব্দ দ্রুত, বাংলা শব্দ গভীর।
দ্রুত জীবনে দ্রুত ভাষা। কিন্তু গভীর চিন্তার জন্য গভীর ভাষা দরকার।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার—যে ভাষায় চিন্তা করি, সেই ধরনের চিন্তা আসে। বাংলায় ভাবলে আবেগপ্রবণ চিন্তা। ইংরেজিতে ভাবলে লজিক্যাল চিন্তা।
ভাষা চিন্তাকে আকার দেয়। নাকি চিন্তা ভাষাকে আকার দেয়?
হয়তো দুটোই। ভাষা আর চিন্তা একে অপরকে প্রভাবিত করে।
কিন্তু আমাদের প্রজন্ম দুই ভাষার মাঝখানে ঝুলে আছে। পুরোপুরি বাংলাও না, পুরোপুরি ইংরেজিও না।
আমাদের চিন্তাও কি মিশ্রিত?
হয়তো এটাই নতুন যুগের ভাষা। মিশ্র। হাইব্রিড। যে ভাষায় আমরা মিশ্র চিন্তা করি।
ভাষা বিবর্তিত হয়। কিন্তু সেই বিবর্তনে আমরা কিছু পাই, কিছু হারাই।
প্রশ্ন হচ্ছে—আমরা যা পাচ্ছি, সেটা যা হারাচ্ছি তার চেয়ে মূল্যবান?
একটু ভাবনা রেখে যান