“আমি খুশি।” এই বাক্যটা বলার সাথে সাথে একটা ফ্রেম তৈরি হয়ে গেল। “খুশি” মানে কী? হাসি? সন্তুষ্টি? উৎসাহ? একটা শব্দ বললাম, কিন্তু আসল অনুভূতিকে বাক্সে পুরে ফেললাম।
ভাষা কি আমাদের চিন্তার সীমানা নির্ধারণ করে?
মনে একটা অনুভূতি জাগল। নাম নেই। কিন্তু শব্দ না থাকলে সেটা প্রকাশ করব কীভাবে? তাই কাছাকাছি একটা শব্দ বেছে নিই। “দুঃখিত।” কিন্তু আসল অনুভূতি আরও জটিল ছিল।
শব্দ কি চিন্তাকে সরল করে দেয়?
ইংরেজিতে ভাবলে একরকম চিন্তা আসে। বাংলায় ভাবলে অন্যরকম। যেমন—”Time is money” আর “সময়ই অর্থ।” প্রথমটিতে গতির অনুভব। দ্বিতীয়টিতে দর্শনের গন্ধ।
প্রতিটি ভাষা আলাদা জগৎ তৈরি করে।
বাংলায় “মা” বললে যে অনুভূতি, ইংরেজিতে “Mother” বললে সেটা আসে না। দুটো ভিন্ন ভাবনার জন্ম দেয়। তাহলে আমি কোন ভাষায় চিন্তা করলে সত্যিকারের আমি?
নাকি প্রতিটি ভাষা আমার একটা দিক প্রকাশ করে?
জার্মানিতে “schadenfreude” শব্দ আছে—অন্যের দুর্দশায় আনন্দ। বাংলায় এর সরাসরি অনুবাد নেই। তাহলে কি আমরা এই অনুভূতি অনুভব করি না? নাকি করি, কিন্তু নাম দিতে পারি না?
শব্দ নেই মানে কি অনুভূতি নেই?
আমি যখন “ভালোবাসি” বলি, তখন হাজারো ধরনের ভালোবাসাকে একটা শব্দে পুরে ফেলি। মায়ের প্রতি ভালোবাসা, স্ত্রীর প্রতি, সন্তানের প্রতি—সব একই শব্দ। কিন্তু অনুভূতি তো আলাদা।
ভাষার দারিদ্র্য কি আমাদের আবেগের দারিদ্র্য তৈরি করে?
অফিসে “স্ট্রেস” বলি। কিন্তু এই শব্দের আগে কী বলতাম? “চিন্তা,” “উদ্বেগ,” “অস্থিরতা”—এগুলো কি একই জিনিস? নতুন শব্দ এসেছে, নতুন অনুভূতিও এসেছে।
ভাষা কি নতুন অনুভূতির জন্ম দেয়?
আরাশ “YOLO” (You Only Live Once) বলে। এই ধারণা বাংলায় কী? “জীবন একবারই?” না, সেই গভীরতা নেই। ইংরেজি কনসেপ্ট, ইংরেজি ভাবনা।
নতুন ভাষা শিখলে নতুন চিন্তার দরজা খোলে।
কিন্তু এখানেই বিপদ। আমি কি ভাষার দাস হয়ে গেছি? আমার চিন্তা কি শব্দের সীমানায় বন্দী?
“সাফল্য” শব্দ শুনলেই মনে আসে টাকা, পদোন্নতি, খ্যাতি। কিন্তু সাফল্য কি শুধু এগুলো? আমার মন বলে অন্য কথা। কিন্তু “সাফল্য” শব্দ আমাকে একটা নির্দিষ্ট দিকে চিন্তা করতে বাধ্য করে।
শব্দ কি চিন্তার গাইড নাকি জেল?
মাঝে মাঝে ইচ্ছা হয় শব্দ ছাড়া ভাবতে। শুধু অনুভূতি, ইমেজ, সেনসেশন দিয়ে। কিন্তু পারি না। শব্দ ছাড়া চিন্তা অসম্পূর্ণ লাগে।
আমি কি ভাষার আদিম? নাকি ভাষা আমার আদিম?
হয়তো দুটোই। ভাষা আমাকে সীমাবদ্ধ করে, আবার মুক্তও করে। একটা শব্দ একটা দরজা বন্ধ করে, আরেকটা দরজা খুলে দেয়।
“প্রেম” বললাম। অনেক কিছু বাদ পড়ল। কিন্তু অনেক কিছুর সাথে যোগ হলাম।
ভাষা একইসাথে বন্ধন আর বন্দিত্ব।
প্রশ্ন হচ্ছে—আমি কি ভাষাকে ব্যবহার করছি নাকি ভাষা আমাকে ব্যবহার করছে?
একটু ভাবনা রেখে যান