ব্লগ

শব্দহীন বজ্রপাত

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

বস যখন আমার কাজ নিয়ে তিরস্কার করল, আমি উত্তর দিতে পারতাম। যুক্তি দিতে পারতাম। কিন্তু চুপ করে রইলাম। সেই নীরবতা তার চেয়ে জোরালো ছিল যে কোনো প্রতিবাদের চেয়ে। কারণ সে বুঝে গেল—আমি তর্ক করছি না, মানে তার কথায় কোনো যুক্তি নেই।

নীরবতা কখনো কখনো চিৎকারের চেয়ে জোরালো।

স্ত্রীর সাথে ঝগড়া। সে অনেক কথা বলল। আমি কিছু বললাম না। শুধু শুনলাম। তার ক্রোধ ধীরে ধীরে কমে গেল। শেষে সে নিজেই বলল, “তুমি কিছু বলো না কেন?” আমার নীরবতা তার সব রাগকে নিরস্ত্র করে দিল।

নীরবতা একটা আয়না। অন্যের কথা প্রতিফলিত করে।

আরাশ যখন পরীক্ষার খারাপ ফলাফল নিয়ে এসেছে, আমি কিছু বলিনি। শুধু তাকিয়ে ছিলাম। সেই তাকানো তার চেয়ে প্রভাবশালী ছিল যত বকাঝকা। কারণ নীরবতায় সে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে।

নীরবতা বুঝিয়ে দেয়। শেখায় না, বুঝিয়ে দেয়।

আমার বন্ধু রহিম যখন তার স্ত্রীর অবিশ্বস্ততার কথা বলল, আমি কোনো পরামর্শ দিইনি। শুধু শুনেছি। মাঝে মাঝে মাথা নেড়েছি। সেই নীরব উপস্থিতি তার জন্য সব উপদেশের চেয়ে বেশি সান্ত্বনা ছিল।

নীরবতা একটা আলিঙ্গন। শব্দ ছাড়া।

গান্ধী নীরব থাকতেন। মন্দেলা নীরব থাকতেন। তাদের নীরবতা লক্ষ লক্ষ শব্দের চেয়ে শক্তিশালী ছিল। কারণ নীরবতা মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে।

কিন্তু সব নীরবতা জোরালো নয়।

ভয়ে চুপ থাকা আর শক্তিতে চুপ থাকা আলাদা। অসহায়তার নীরবতা আর প্রজ্ঞার নীরবতা এক নয়।

আমি যখন বসের অন্যায়ের বিরুদ্ধে চুপ থাকি চাকরি হারানোর ভয়ে, সেটা দুর্বলতার নীরবতা। কিন্তু যখন স্ত্রীর রাগের জবাবে চুপ থাকি তাকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য, সেটা শক্তির নীরবতা।

নীরবতার ধরন গুরুত্বপূর্ণ।

মৃত্যুর সামনে সব মানুষ নীরব। কিন্তু সেই নীরবতা পরাজয় নয়। পরম সত্যের সামনে নতি স্বীকার। কারণ মৃত্যুর কোনো উত্তর দেওয়ার ভাষা নেই।

প্রকৃতি নীরব। পাহাড়, সমুদ্র, আকাশ—সব নীরব। কিন্তু তাদের নীরবতা অর্থহীন নয়। গভীর অর্থপূর্ণ। তারা না বলেও সব বলে।

প্রেমেও নীরবতা আছে। প্রেমিক-প্রেমিকা যখন একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে, কোনো কথা বলে না। কিন্তু সেই নীরবতায় হাজার কবিতা লুকিয়ে।

নীরবতা কখনো ফাঁকা নয়। ভর্তি।

অফিসের মিটিংয়ে যখন সবাই নিজেদের মতামত দিচ্ছে, আমি চুপ। কিন্তু শেষে যখন কথা বলি, সবাই শোনে। কারণ যে কম কথা বলে, তার কথার ওজন বেশি।

নীরবতা কথার মূল্য বাড়ায়।

কিন্তু নীরবতার একটা সমস্যা আছে। ভুল বোঝাবুঝি। যে নীরব, তাকে নিয়ে অন্যরা অনুমান করে। কখনো ঠিক, কখনো ভুল।

আমার নীরবতা কেউ ভাবে ঔদ্ধত্য। কেউ ভাবে বিষণ্ণতা। কেউ ভাবে প্রজ্ঞা। আসলে কী, তা আমি ছাড়া কেউ জানে না।

তবুও নীরবতার শক্তি অপ্রতিরোধ্য।

শব্দ একদিন হারিয়ে যায়। কিন্তু নীরবতা থেকে যায়। স্মৃতিতে। হৃদয়ে।

সবচেয়ে জোরালো কথা হয়তো সেটাই—যেটা বলা হয় না।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

জীবন

সংখ্যা

ডিসেম্বর ২০২৫ · 7 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *